প্রতিদিনই ডুবছে বন্দরনগরী; কারণ কী ? – Ctgnews
ctgnew

প্রতিদিনই ডুবছে বন্দরনগরী; কারণ কী ?

আবু আজাদ :: দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার চিত্র। ঘণ্টা প্রতি ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই এই শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে যায়। বর্ষায় পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন নির্দিষ্ট কোন একটি কারণে নয়, বরং সমন্বয়হীনতা, অতিবৃষ্টি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি জোয়ারের পানি ঠেকানোর মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।

সাগর বেষ্টিত ৬০ বর্গমাইলের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বর্ষাকালে সারাদেশের তুলনায় চট্টগ্রামের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৬৮৭ মিলিমিটার। কিন্তু গত তিনদিনে এখানে তিনশ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোরা ও পরবর্তী নিন্মচাপের ফলে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে লাগাতার প্রবল বর্ষণ চলছে।

চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারি আবহাওয়াবিদ শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সোমবার সকাল ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় ১৯৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাগর থেকে যখন বাতাস আসে তখন জলীয় বাষ্পটা এ অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই কারণে যখন এই অঞ্চলে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়ে যায় তখন এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতটা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।’

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার জন্য প্রধান যে দু’টি কারণ চিহ্নিত করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তার একটি অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যাবস্থা। নগরীর ড্রেনগুলোর পানি ধারণ কমে গেছে পাশাপাশি নগরীতে ঢুকে যাওয়া জোয়ারের পানি বের হতে পারছে না।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘মানুষ তাদের সলিড আবর্জনাগুলো ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিয়ে ড্রেনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। এই জন্য মাঝে মাঝে দশ মিনিটের বৃষ্টি হলেও এটা উপচে পড়ে।’

অভিযোগ রয়েছে, নগরীর খাল নর্দমাগুলো প্রতিনিয়ত পরিষ্কার করা হয় না। লোক দেখানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কারণে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাচ্ছে না। নগরীর প্রায় খালগুলোতে আবর্জনা দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। এইসব খালগুলো ভালো করে খনন করার তেমন উদ্যোগ নেই। বরং কিছু কিছু খাল থেকে আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে রাখা হয়। ফলে বৃষ্টি হলে সেই আবর্জনাগুলো ফের খালে গিয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পর্যায়ক্রমে সকল খাল থেকে মাটি উত্তোলন করবো। মাটি উত্তোলন যখন করবো এবং ড্রেন যখন নিয়মিত পরিষ্কার করবো তখন ধারণ ক্ষমতাটা অটোমেটিক বৃদ্ধি পাবে।’

তবে সিটি মেয়র বারবার আশ্বাস দিলেও ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলছেনা নগরবাসীর। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নগরীর সিংহভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়ে থাকে চাক্তাই খাল দিয়ে। এ কারণে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চাক্তাই খাল পরিষ্কার থাকা অপরিহার্য।

বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে বর্ষাকে সামনে রেখে গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে চাক্তাই খাল খনন শুরু করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এতে ১ লক্ষ ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত প্রায় সাত মাসে এ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৫ শতাংশ অর্জন হয়েছে। এমন পরিস্থিতি নগরবাসী প্রশ্ন তুলেছেন, সঠিক নিয়মে কি চাক্তাই খাল খনন করা হয়েছে বা হচ্ছে? নাকি লোক দেখানো খনন কাজ করেই দায় এড়াচ্ছে চসিকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চাক্তাই খালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খালের বিভিন্ন এলাকায় এখনো জমাট হয়ে আছে পলি মাটির স্তুপ। কোথাও আবার ভরাট হয়ে আছে। এছাড়া এক বছর আগে চাক্তাই খালের ৪৮জন দখলদারকে চিহ্নিত করে তালিকা করা হলেও তাদের উচ্ছেদেও দৃশ্যমান কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। উল্টো অভিযোগ আছে, চাক্তাই খাল দখল করে খোদ চসিকই স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, ‘জোয়ার-ভাটার সময় পানি উপরে ওঠে, এটাকে বাধা দেয়ার জন্য যে সুইচ গেইটের দরকার ছিলো আমাদের সে সুইচ গেইট নেই। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য আমাদের জলাবদ্ধতা হচ্ছে।’

এদিকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সমন্বয়হীনতা। জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তি ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। কারণ একই বিষয় নিয়ে একটি প্রকল্প জমা রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমেও জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হয়েছে একটি প্রকল্প। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ প্রকল্পটি নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৬ মাস কাজ করেছি। ১১ মাস ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকা সার্ভে করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ার। প্রকল্পটি তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সিডিএও একই বিষয় নিয়ে প্রকল্প পাঠিয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। এখন সরকার যেটা চায়, সেটা পাস হবে।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘পিইসি সভায় এ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন একনেকে উপস্থাপন হবে। সেখানে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে চট্টগ্রামবাসীর দুঃখ জলাবদ্ধতা দূর করতে কাজ শুরু হয়ে যাবে।’

সিটিজিনিউজ/এজেড

সর্বশেষ সংবাদ


নোটিশ : “এই মাত্র পাওয়া” খবর আপনার মোবাইলে পেতে আপনার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন থেকে START পাঠিয়ে দিন 4848 নম্বরে ।
ctgnew
প্রধান উপদেষ্টা : আব্দুল গাফফার চৌধুরী
সম্পাদক : সোয়েব উদ্দিন কবির
ঠিকানা : ৯২ মোমিন রোড ,
শাহ আনিস মার্কেট ৫ম তলা, চট্রগ্রাম ।
মোবাইল : ০১৮১৬-৫৫৩৩৬৬
টিএন্ডটি : ০৩১-৬৩৬২০০

Design and Development by : Creative Workshop

53 queries in 1.438 seconds.