বেঁচে থাকার পরশ পাথর ! – Ctgnews
ctgnew

বেঁচে থাকার পরশ পাথর !

সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের নৃত্য পরিবেশন। ইনসেটে স্কুলের প্রিন্সিপাল শামীম আহমেদ।

সাফি-উল হাকিম :: ‘মাঝে মধ্যেই বুক চাপড়ে কাঁদতে হয় আমাকে, যখন শুনি আদুরে ছেলেটিকে নিয়ে যাবে তাদের মা-বাবাা’। তাদের ভালোবাসা, আদর আমাকে যে গভীর মায়ায় বেঁধে ফেলেছে। আমার বেঁচে থাকার পরশ পাথর এখন তারাই। এভাবেই ২৫ বছরের কর্মজীবনে নিজের ভেতর জমিয়ে রাখা কষ্টের কথা গুলো মঙ্গলবার (৯ মে) সিটিজিনিউজকে বলেন, সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. শামীম আহমেদ।

নগরীর জাকির হোসেন রোড ঝাউতলা এলাকায় অবস্থি সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলটিতে এখন প্রায় ২০০ বাচচা পড়াশুনা করছে ।

প্রধান শিক্ষক মো. শামীম আহমেদ বলেন, রিক্সাচালক, দিনমজুর থেকে সমাজের সব শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের এই স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে চট্টগ্রামে এই সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলটিই ছিল। তখন পিছিয়ে পড়া সন্তানদের মা-বাবার কাছে একমাত্র ভরসাস্থল ছিল এই স্কুলটিই। এই স্কুলটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ব্যবহারিক বিধি-নিয়ম গুলো বুঝানোর চেষ্টা করা হয়। এখানে সবসময় মাথায় রাখা হয় ৮ বছরের বাচ্চাটি ৪ বছরের বাচ্চার মত আচরণ করবে। তাদের মেধা বিকাশের জায়গাটি আমাদের বুঝতে হবে। মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়ে এমন কোন কিছু তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না । এই বিষয়গুলো বুঝেশুনে বাচ্চাদের স্কুলিং করাতে হয়। দেখা গেছে এই অবস্থায় কিছুদিন যাওয়ার পর মা-বাবারা অধৈর্য্য হয়ে যাচ্ছেন।

অভিভাবকরা মনে করেন ৩ মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিন মাসের মধ্যে ভালো মনে হলে স্কুলে রাখেন না হলে দেখা গেছে অন্যকোন স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন । যে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন সে স্কুলে দেখা গেছে তিনমাসের মধ্যে ভালো না লাগলে আবার আরেক স্কুলে। মাঝখান থেকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুটি টানাহেঁচড়ার মধ্যে পড়ে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে বসে আছে। ভাল করতে গিয়ে খারাপ হয়ে বসে আছে। শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে হারাতে হয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে এসব অসচেতন মা-বাবা।

একসময় ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবি ছাত্র ছিলেন শামীম আহমেদ। পড়াশুনা করা অবস্থায় স্বপ্ন ছিল এমন কোন পেশায় যোগ দিবেন মানুষের কষ্ট-বেদনাগুলো বুঝতে পারেন। দুঃখকে জয় করে মানুষের মুখে হাসি ফুটাবেন। সেই আকাঙক্ষা থেকে মনোবিজ্ঞান থেকে মাস্টার্স শেষ করে ১৯৯৬ সালে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রামের এই সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলটিতে।

এখন তার চাকরির বয়স প্রায় ২২ বছর। পাওয়া-না পাওয়ার কষ্ট কখনও কাছে ভিড়তে দেন না শিক্ষক শামীম আহমেদ। তবে মাঝে মধ্যেই অভিভাবকদের অসচেতনা এবং অপরিনামদর্শীতামূলক আচরণ তাকে ব্যথিত করে বসে। একটি শিশুকে যখন স্কুলিং করে ধিরে ধিরে ভালোর দিকে নিয়ে যান ঠিক তখন অভিভাবকদের আকাশ কুসুম চিন্তা তার ভাবনা আকাশে বজ্রপাতের সৃষ্টি করে। বুক-চাপড়ে নিরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কিছুই থাকে না। আবার দেখা গেছে বিভিন্ন স্কুল, বিদেশের ট্রেনিং সেন্টার ঘুরে এসে আমার কাছে ফিরছে। তখন আবার মনে হয় হারিয়ে যাওয়া সন্তানটিকে পেলাম’। জানান শামীম আহমেদ।

প্রিন্সিপাল শামীম আহমেদ সিটিজিনিউজকে বলেন, ‘আমরা এখানে বয়স ভিত্তিক শ্রেণি গঠন করে বাচ্চাদের পড়াশুনা চালিয়ে থাকি। আমাদের রয়েছে প্রি-প্রিপারেটরি ক্লাস, প্রি-প্রাইমারি ও ভোকেশনাল ক্লাস। আমাদের প্রায় ৪ হাজার স্কোয়ার ফুটের এই স্কুলটিতে রয়েছে সুপরিসর খেলার মাঠ, খেলার মাঠে রয়েছে প্লে ইকুইপমেন্ট আর রয়েছে সুদৃশ্য একটি শহীদ মিনার। স্কুলের সময় সূচী সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের মধ্যে চট্টগ্রামে আমরাই সর্বনিম্ন বেতনে বাচ্চাদের পড়াই। এখানে মাসিক ফি ৩০০ টাকা। যার মধ্যে ১৫০ টাকার টিউশনফি ও  টিফিন ব্যবস্থা করা হয়।

এখন পর্যন্ত স্কুলটিকে ২০১৫ সালের নতুন স্কেলের আওতায় না আনায় হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এই এলাকায় অন্যান্য স্কুল নতুন পে স্কেলের আওতায় আসলেও আমাদের সুইড বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলটিকে এখনো কেন আনা হচ্ছে না তা বুঝতে পার ছি না। এসময় তিনি শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ করেন দ্রুত স্কুলটিকে যদি নতুন পে-স্কেলের আওতায় আনা যায় তাহলে স্কুলটির ২২ জন শিক্ষক যে পরিশ্রম করে যাচ্ছে তার উপযুক্ত মূল্যায়ন করা হবে।

বর্তমানে স্কুলটিতে সর্বমোট ২০০জন বাচ্চা রয়েছে। তাদের আনা নেওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা একে বারে অপ্রতুল। একটি মাত্র হিউম্যান হলার দিয়ে তাদের আনা নেওয়া করাতে হয়। এসব বাচ্চাকে বাড়ি থেকে স্কুল পর্যন্ত আনা নেওয়া দায়িত্বও স্কুল কর্তৃপক্ষের। এ অবস্থায় স্কুলটিতে দুটি মাইক্রোবাসের বেশি জরুরি। এতে করে এসব বচ্চাকে আনা নেওয়াতে কষ্ট পোহাতে হবে না।

১৯৭২ সালে এর ভিত্তি প্রস্তর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন হলেও জাকির হোসেন রোডের ঝাউতলা রেলওয়ের জায়গায় কর্নেল আলি আহম্মদ ১৯৯৬ সালে স্কুলটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

বর্তমানে স্কুলটির গভার্নিং বডির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন মো. মোসলেম।

অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ধৈর্যশীল বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্বফলতা পেয়েছেন। এ সম্পূর্ণ সমন্বয়ের ব্যাপার। স্কুলে ভর্তি করালে ধৈর্য ধরে থাকতে হয় অভিভাবকদের। আমরা অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকি বাচ্চাদের উপর। বাকীটা আল্লাহর উপর ভরসা রাখি।
এই স্কুলের ছাত্র আরাফাত এখন ধিরে ধিরে পড়তে লিখতে পাড়ছে। স্কুলটিতে প্রায় ৮ বছর ধরে পড়াশুনা করছে সে। ক্লাসের বিভিন্ন পরীক্ষায় সে প্রায় ভালো করে থাকে বলে জানিয়েছেন, আরাফাতের বাবা সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুর উদ্দীন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর চৌধুরী।

জাহাঙ্গীর চৌধুরী সিটিজিনিউজ নিউজকে বলেন, এটি অনেক দিনের ধৈর্য্যরে ফসল। একেবারে শুরু থেকে আমি আমার ছেলেকে এখানে ভর্তি করিয়েছি। অনেকে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিত অমুক জায়গায় এর চেয়ে ভালো স্কুলিং ব্যবস্থা আছে। ঘুরে ফিরে খোঁজ নিয়ে দেখতাম চট্টগ্রামের মধ্যে অভিজ্ঞতার দিক থেকে সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলটি সবচেয়ে বেশি বাচ্চাদের যতœ নিয়ে পড়াশুনা করায়। এটির বিকল্প এখন অনেক অভিভাবকই ভাবতে পারেন না।

——–
জেইউএস

 

সর্বশেষ সংবাদ


নোটিশ : “এই মাত্র পাওয়া” খবর আপনার মোবাইলে পেতে আপনার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন থেকে START পাঠিয়ে দিন 4848 নম্বরে ।
ctgnew
প্রধান উপদেষ্টা : আব্দুল গাফফার চৌধুরী
সম্পাদক : সোয়েব উদ্দিন কবির
ঠিকানা : ৯২ মোমিন রোড ,
শাহ আনিস মার্কেট ৫ম তলা, চট্রগ্রাম ।
মোবাইল : ০১৮১৬-৫৫৩৩৬৬
টিএন্ডটি : ০৩১-৬৩৬২০০

Design and Development by : Creative Workshop

49 queries in 1.180 seconds.