ভুল গুলো কি ছেলেমানুষীর ফুল ছিল না? – Ctgnews
ctgnew

ভুল গুলো কি ছেলেমানুষীর ফুল ছিল না?

শিল্পী বলেছেন, ‘ভুল সবই ভুল এ জীবনে’। বাস্তবিকই মানুষ মাত্রই ভুল করে।আর মানব সমাজে ভুল বুঝাবুঝি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।ভুলের দোহাই দিয়ে বড় বড় অপরাধ করেও অনেকে রেহাই পান। আবার সামান্য ভুলের কারনে গুরু দণ্ড পান এমন ব্যক্তির সংখ্যাও ভুরি ভুরি। খুদিরামের মতো ভুল করেও সাজা পাওয়া ব্যক্তির জন্য মানুষ এখনো আফসোস করে। ভুলের কারনে যুগে যুগে অনেকে জীবন দিয়েছে…তবু ভুল রয়ে গেছে। ভুল বুঝাবুঝির জন্য যে কতো কান্ড ঘটে তার ইয়ত্তা নাই।সুকুমার রায়ের ’অবাক জলপান’ এ আমরা সেটা দেখেছি। ভুল বুঝাবুঝির জন্য অনেকে প্রহার খেয়েছেন,অনেকে ডাক্তারের কাছে হেনস্থা হয়েছেন। ভুল বুঝাবুঝির জন্য ভেঙ্গেছে স্বর্গীয় প্রেম,আবার বাবা মায়ের মতো চিরন্তন সম্পর্কগুলোও নষ্ট হয়েছে ভুল বুঝাবুঝির জন্য। ভুলবুঝে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকারক অন্যায় কাজগুলোর একটি হলো অপবাদ। যে ব্যক্তি অন্যকে অপবাদ দেয় সে অন্যের ক্ষতি করার পাশাপাশি নিজেরও ক্ষতি করছে । নিজের আত্মাকে পাপের মাধ্যমে কলুষিত করে।

এবার একটি ভুল বুঝাবুঝির গল্প বলি,যার জন্য লঙ্কাকান্ড ঘটেছিল। উদারহরনের মাধ্যমেই শুরু করি তাহলে। এক ভদ্রলোক তাঁর পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের কাছ থেকে মুঠোফোনে একটি খুদে বার্তা পেলেন, ‘স্যার, আমি কিছুদিন ধরে আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার ওয়াইফাইকে ভোগ করছি। যখন খুশি তখন। যেমন খুশি তেমন করে ভোগ করছি। হঠাৎ করে আমার মধ্যে একটা অপরাধবোধ জেগে ওঠায় ক্ষমা চাইতেই এই বার্তা পাঠালাম। আমি অত্যন্ত দুঃখিত।’ কিন্তু বুঝতে না পেরে ভদ্রলোকের স্ট্রোক হয়। তিনি ভর্তি হন হাসপাতালে। পরদিন ভদ্র লোকের বন্ধু হাসপাতালে দেখতে গিয়ে জিগাসা করলেন বন্ধু কি হয়েছে? ভদ্র লোক বার্তাটি দেখিয়ে বললো দেখ আমার ওয়াইফকে একজনে ভোগ করেছে। বন্ধু দেখে বলল, আরে বোকা ওয়াইফ নয় এখানে তো ওয়াইফাই লিখা। তখন ভদ্র লোক বুঝতে পারলো। বিষয়টি ছিল বুঝার ভুল। ভদ্র লোক বুঝতে পারলেও গল্পে রুদ্র নামের ছেলেটির মনের অব্যক্ত আর্তনাদ বুঝলো না এ সভ্য সমাজের ইট পাথরে থাকা মানুষগুলো। সালটা ২০১১। রুদ্র নামের মেধাবি ছাত্র এস এস সি পরীক্ষার্থী। অজোপাঁড়া গাঁয়ের ছেলেটির একবুক স্বপ্ন নিয়ে পথচলা । ফেব্রুয়ারি মাস পরীক্ষা চলছে। টেনশন কিভাবে ভালো ফলাফল করবে। বাবা মায়ের বড় সন্তান পরিবারের চাওয়াও অনেক। রুদ্র ব্যস্ত সমসময় পড়াশুনা নিয়ে। শুনল তার এক কাজিন নিলিমা সেও পরীক্ষা দিচ্ছে। নিলিমা শহরেই থাকে। ভাবলো তার সাথে যোগাযোগ করলে কেমন হয়। নিশ্চয় ভালো সাজেশান পাওয়া যাবে। নিলিমার বাবা রুদ্র র বাবা আত্নীয় এবং দুজনে ভালো বন্ধু। মজার ব্যাপার হলো নিলিমার মা রুদ্র বাবাকে বলতো ভাই আমরা আত্নীয়তা করবো। অর্থাৎ নিলিমাকে রুদ্রর সাথে বিয়ে দিবে। নিলিমার কথা রুদ্র তার ফুফুদের কাছ থেকে শুনতো। ফুফুরা বলতো রুদ্র ভালোভাবে পড়াশুনা করে প্রতিষ্ঠিত হও নিলিমাকে বিয়ে করাবো। ফুফুদের কথায় রুদ্র কর্নপাত করতো না। কারন নিলিমা শহরে থাকে। পছন্দ অপছন্দের বিষয়ও আছে। রুদ্রের সাথে নিলিমার ৪র্থ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ২০০৪ সালে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল।

১ ফেব্রুয়ারি নম্বর সংগ্রহ করে নিলিমা কে কল দিল। পরিবারের মোবাইল রিসিভ করল তার ছোট ভাই মোহন । একে একে পরিবারের সবার সাথে কথা হলো। নিলিমার মা ছোটবেলায় রুদ্র কে খুব আদর করত। পরীক্ষার জন্য সাজেশান চাইল রুদ্র। রুদ্র ভেবেছিল নিলিমা অনেক মেধাবী। রুদ্রের ধারনা ভুল ছিল। নিলিমার স্বপ্ন ডাক্তার হবে। রুদ্রও চাইছিল নিলিমার স্বপ্ন পূরন হোক। রুদ্র গ্রামে থেকেও নিলিমাকে পরীক্ষার সাজেশান দিয়ে সহযোগীতা করেছিল। রুদ্র নিলিমার চেয়ে মোবাইলে বেশি কথা বলত ছোট ভাই মোহনের সাথে। রুদ্র র সবকিছু তে মোহনের মিল ছিল। মোহন সাহিত্য ও ক্রীড়ামোদী ছিল। রুদ্র ফুটবল খেলায় ব্রাজিল সমর্থন করতো মোহনও। রুদ্র ও মোহন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছে বটে। রুদ্রের পরীক্ষা শেষ। অবসর সময় বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দেখে আর মোহনের সাথে কথা বলে সময় কাটতো তার। রুদ্রের এখনও ব্যাক্তিগত মোবাইল নেই। অবশেষে প্রবাস থেকে তার মামা মোবাইল পাটালো। নতুন মোবাইল কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। নতুন সিম কিনা হল। সাথে ২০০

মিনিট টকটাইম ও ১০০ এস এম এম ফ্রি। নতুন নম্বর কেউ জানে না। অনেক বন্ধুকে এস এম এস করে চমকে দিয়েছিল রুদ্র। এবার ভাবলো মোহনকে চমকে দেয়া যাক। বলে রাখি নিলিমা কিন্তু বাসায় নেই। বেড়াতে গেছে তার নানুর বাড়িতে। মোহনও পরিবারের মোবাইল ব্যবহার করে। রুদ্র কয়েকটা এস এম এস করলো। মোহন স্কুলে, নিলিমা বাড়িতে নেই। তাদের মায়ের হাতে মোবাইল। এস এম এস পেয়ে নিলিমার মা ফোন করল রুদ্রর মোবাইলে। রুদ্র মোবাইল ঘরে চার্জে রেখে ক্রিকেট খেলতে মাঠে গেছে। এ দিকে বারবার ফোন করে যাচ্ছে নিলিমার মা। অবশেষে রুদ্রর মেঝ ফুফু নিলিমা লেখা দেখে ফোন রিসিভ করল। কথা বলে পরিচয় দিয়ে দিল। ততক্ষনে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে। নিলিমার মায়ের অকথ্য ভাষা রুদ্র র পরিবারের সবাই কে ব্যাথিত করেছিল। সন্ধ্যা রুদ্র বাড়িতে ফিরে সবকিছু শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। এমন কিছু কখনও চায় নি রুদ্র। নিলিমার মা মনে করেছিল এস এম এস নিলিমা কে উদ্দেশ্য করে। তবে রুদ্র কোন খারাপ এস এম এস দেয় নি। পিকচার এস এম এস লিখা ছিল ‘ তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে অসহায় আমি বহু দূরে ‘। রুদ্র জানতো নিলিমা বাড়িতে নেই।

দীর্ঘ দুই মাস কথা বলেছে নিলিমার সাথে কখনও খারাপ বলে নি। এস এম এস ছিল শুধু মোহনের সাথে দুষ্টামি করার জন্য। রুদ্র বিষয়টি হালকা ভাবে নিলেও তারা খুব বাজে ভাবে নিয়েছে। এমনকি নিলিমার বাবা রুদ্র র বাবাকে ফোন করে অনেক কথা শুনিয়েছে। খুবই মর্মাহত ও বাকরুদ্ধ হয়েছে রুদ্র। রুদ্র বাবা তো স্টোক করে বসেছিল। রুদ্র র মা রুদ্র কে বলে তোর মত সন্তান জন্ম দেয়া আমার পাপ হয়েছে। গাড়ির নিচে পড়ে মরতে পারিস না। কেন আরেক জনের মেয়ে কে মেসেস পাটাস। রুদ্র কখনও এমনটি চায় নি। রুদ্র বুঝতে পারে নি শহরের চার দেয়ালের মাঝে থাকা মানুষগুলোর মনমানসিকতা এতোটাই খারাপ হতে পারে। নিজেকেও শান্তনা দিতে পারতেছিল না রুদ্র। কারন সে তো অপরাধ করে নি। এটা শুধু বুঝার ভুল ছিল। রুদ্র বড়ই অসহায়। রুদ্র নিলিমা কে নিয়ে এমনটি কখনও ভাবে নি। রুদ্র কোন প্রতিবাদও করে নি। কেন না সে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে পেলেছিল। মনে করেছিল হয়ত নিলিমা, মোহন তাকে বুঝবে। তার মা কে বুঝিয়ে নিবে। কিন্তু তারাও ছিল নিরব। রুদ্র আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। কেননা অপরাধ না করেও সে অপরাধী। মিথ্যা অপবাদ তাকে এখনও কাঁদায়। কেন না শুধু রুদ্রের কারনে একটি আত্নার সস্পর্ক শেষ। নষ্ট হয়েছে রুদ্রের বাবার বন্ধুত্ব। অবাক হওয়ার মতো বিষয় রুদ্র বুঝতে পারেনি তার ভুলটা কোথায়? ভুল করতেই পারে মানুষ,তবে ভুল বুঝতে না পারলে শোধরায় না কেউ। অল্প বয়সের এই ছেলেমানুষীটা কি তারা বুঝেনি? নাকি বুঝে ও না বুঝার ভান করেছে? নাকি অহংকার তাদের বুঝতে দেয় নি একটি ছেলের আবেগ আর অব্যক্ত আর্তনাদ। আমরা এখনও আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি পালটাতে পারি নি বলে সমাজ ব্যবস্থা আজও কলুষিত।

লেখক:: অপু ইব্রাহিম
তরুণ সাংবাদিক ।

সর্বশেষ সংবাদ


নোটিশ : “এই মাত্র পাওয়া” খবর আপনার মোবাইলে পেতে আপনার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন থেকে START পাঠিয়ে দিন 4848 নম্বরে ।
ctgnew
প্রধান উপদেষ্টা : আব্দুল গাফফার চৌধুরী
সম্পাদক : সোয়েব উদ্দিন কবির
ঠিকানা : ৯২ মোমিন রোড ,
শাহ আনিস মার্কেট ৫ম তলা, চট্রগ্রাম ।
মোবাইল : ০১৮১৬-৫৫৩৩৬৬
টিএন্ডটি : ০৩১-৬৩৬২০০

Design and Development by : Creative Workshop

49 queries in 0.779 seconds.