সুখ সইলো না বেশিদিন ! – Ctgnews
ctgnew

সুখ সইলো না বেশিদিন !

দুটি ছবিই নিখোঁজ সোহেলের। একটি ভোটার আইডি কার্ড থেকে সংগৃহীত অপরটি মানুষিক ভারসাম্যহীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তির আগ মূহূর্তের।

হাকিম মোল্লা : পঞ্চাশোর্ধ বয়সী বাবা আছির উদ্দীন ও মাতা বানু বেগমের নির্ভরতার একমাত্র অবলম্বন ছেলেকে হারিয়ে প্রায় পাগল হয়ে গেছেন। ছেলেকে হারিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে বারবার স্মৃতি মনে করে মুর্ছা যাচ্ছেন।

স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান সোহেল রানাকে নিয়ে গ্রামের সহজ-সরল কৃষক আছির উদ্দীনের সুখের সংসার। কিন্তু এই সুখ সইলো না বেশিদিন। সুখের ঘর ছেড়ে এখন তাদের সময় কাটে স্টেশন থেকে স্টেশনে। গভীর রাতে ছুটে বেড়ান মাজার থেকে মাজারে। সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন একমাত্র সন্তান সাত রাজার ধনকে খুঁজে পেতে।

যাকে দেখেন তাকেই বলে ফেরেন ‘দুই কানে তিনটি করে ছিদ্র, পড়নে সবুজ কালো লুঙ্গি ও কালো ফুল হাতাওয়ালা গেঞ্জি, গলায় একাধিক তাবিজের মালা পড়েছিল যেদিন সোহেল বাপ আমার হারিয়ে যায়।’

ঢাকার শাহবাগ মোড়ে অবস্থিত পিজি হাসপাতালে মানুষিক ভারসাম্যহীন সোহেলকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে হাসপাতাল নিরাপত্তাকর্মীদের অবহেলায় পিজি হাসপাতাল বর্তমান নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিখোঁজ হয় সে। অর্থঅভাবে সেই হাসপাতালেরই কর্তব্যরত নারী চিকিৎসকের স্বামীর পরামর্শে ভর্তি করিয়েছিলেন সোহেলকে।

পিজি হাসপাতালের ১২ তলার ১০ নম্বর বেডে চিকিৎসা চলছিল সোহেলের। চিকিৎসার ২৭ দিনের মাথায় রাতে কোন এক সময় ১০ তলা থেকে সিড়ি বেয়ে নেমে হাসপাতালের বাইরে চলে যায়। এসময় হাসপাতালে মা-বাবা দুজনই অবস্থান করছিলেন। গভীর রাত পর্যন্তও জেগে ছিলেন সন্তানকে যে ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে সেই ওয়ার্ডের সামনে। একটু চোখ বন্ধ করতেই ছেলে কখন বের হয়ে হাসপাতাল আঙ্গিণা ছেড়ে চলে গেছে টের পায়নি কেউ।

হাসপাতালের কলাপসিপল গেট না থাকায় তার বের হয়ে যাওয়া আরও সহজ হয়। মা-বাবা বিষয়টি বুঝতে পেরে কর্তব্যরত নার্স ও হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে খোঁজাখুজি করতে থাকেন। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় হাসপাতালের আনাচে-কানাচে। পরক্ষণে হাসপাতাল আঙ্গিণার বাইরে গিয়ে তাকে খোঁজা আরম্ভ করেন মা-বাবা। কেউ বলে এদিকে গেছে কেউ বলে এইমাত্র দেখলাম এভাবে শাহবাগ মোড়ের ফুলের দোকান, শিশুপার্ক কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না সোহেলকে। না পেয়ে পিজি হাসপাতাল এলাকাধীন শাহবাগ থানায় একটি নিখোঁজ ডায়রিও করেন সোহেলের মা-বাবা।

ডায়রি করতে গেলে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বাইরে চলে যায় জানালে প্রথম দিকে ডায়রি করতে গড়িমসি করে পরে মা-বাবার কষ্ট দেখে পুলিশ কর্মকর্তারাও দুঃখ প্রকাশ করে ডায়রি গ্রহণ করেন বলে জানান আছির উদ্দীন। চোখের সামনে কলিজারটুকরা এভাবে হারিয়ে যাবে সে কথা ভাবতেই স্মৃতি মনে করে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন আছির উদ্দীন ও বানু বেগম।

আছির উদ্দীন বলেন, আমরা গরীব মানুষ। আমার সুস্থ্য ছেলে হঠাৎ করেই মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এস.এসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করায় পুলিশে চাকরিও হয়ে গিয়েছিল। চাকরিতে যাওয়ার তিন মাসের মধ্যে ছেলের এই ধরণের পরিবর্তনে আকাশ ভেপে পড়া অবস্থা মা-বাবার উপর। কৃষি কাজনির্ভর আছির উদ্দীন ফসল ফলিয়ে যে আয় করেন তা দিয়েই একমাত্র ছেলের পড়াশুনা চালিয়েছেন। ছেলে এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করায় মা-বাবার মুখে যখন হাসি থাকার কথা তখন তাদের কান্নায় বুক ভাসাতে হয়। চোখে মুখে হতাশা আর ছেলেকে পাওয়ার করুণ আকুতি দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ফেলতে হয়েছে এই প্রতিবেদককেউ
চট্টগ্রামের সদরঘাট কালি বাড়ী মোড়ের মালাই শো-রুম ও ক্ল্যাসি এ্যান্ড ক্রাফট এর পরিচালক মো. বশির উল্যাহ তারঁ বাড়িতে হতভাগা মা-বাবাকে আশ্রয় দিয়েছেন। বশির উল্যার কাছ থেকে খবর পেয়েই সিটিজিনিউজের এই প্রতিবেদক ছুটে যান নিখোঁজ সন্তানের মা-বাবার সাথে সরাসরি কথা বলার জন্য।

বুধবার (০২ আগস্ট) নগরীর কালিবাড়ি মোড়ে অবস্থিত ক্ল্যাসি অ্যন্ড ক্রাফটের শো-রুমে বসেই কথা হয় নিখোঁজ সোহেলের মা-বাবার সাথে।
মা-বাবা দু’জনই পঞ্চাশোর্ধ বয়সী। কথা বলতে বলতে শব্দ জড়িয়ে যায়। দু-একটি কথা বলতেই চোখ পানিতে ভিজিয়ে ফেলেন। বার বার হাত ধরে আকুতি করতে থাকেন আর বলেন ‘বাবা আমার ছেলে আপনি খুঁজে দিতে পারবেন। আমার সোহেল অনেক দিন ধরে কিছুই হয়তো খাচ্ছে না। সোহেল আমাদের কলিজারটুকরা। ও অনেক আদরের।’ একটা দিনও যে ছেলেকে ছেড়ে থাকেন নি সেই ছেলে কোথায় আছে, কিভাবে আছে, কি খাচ্ছে এসব ভাবতেই কান্নাকাটি করতে শুরু করেন মা-বাবা।

তাদের একটিমাত্র সন্তান সোহেল । এই বয়সে এসে সন্তানকে এভাবে হারিয়ে ফেলে বাবা-মা দুজন পাগলের মত ঘুরছেন এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে। মসজিদের বারান্দা, মন্দিরের বারান্দা,মাজার শরীফের বারান্দা, বাসের কাউন্টার, শিশু পার্ক, রেল স্টেশন সবখানেই চষে বেড়াচ্ছেন ।
চলতি বছর রোজার ঈদের ৫ দিন আগে সোহেলকে চট্টগ্রামের টাইগার পাস মোড়ে দেখতে পান বাবা। ছেলেকে দেখা মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে উঠতেই চোখের আড়াল হয়ে যায়। সেই থেকে তাদের চট্টগ্রামে থেকে যাওয়া।

কখনো বের হন কাক ডাকা ভোরে আবার কখন রোদ্রতপ্ত দুপুরে। আবার কখন এই দুই মা-বাবাকে দেখা যায় গভীর রাতে নগরীর বাস স্টেশন, ট্রেন স্টেশন, সড়কের পাশে ফুটপাতে ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যক্ষের ধন একমাত্র ছেলের মুখ দেখার আশায়।

সামনে যাকে পান তাকেই কান্না স্বরে বলে উঠছেন ‘দুই কানে তিনটি করে ছিদ্র, পড়নে সবুজ কালো লুঙ্গি ও কালো ফুল হাতাওয়ালা গেঞ্জি পড়েছিল যেদিন সোহেল হারিয়ে যায়। গলায় একাধিক তাবিজের মালা একসাথে পরিধান করে থাকতে পারে ’।

নওগাঁ জেলার পোস্ট অফিস তিন পুকুর, শ্রী ধরপুর গ্রামের একজন সহজ-সরল মানুষ নিখোঁজ সোহেল রানার পিতা মোঃ আছির উদ্দীন। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া কৃষি ও ভিটার ২২ কাঠা জমি ছাড়া আর কোন সম্পদ ছিল না।  স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান সোহেলকে নিয়ে সুখে-শান্তিতেই দিন কাটছিল। একমাত্র ছেলে লেখাপড়া শিখছে চাকরি করবে। সুখে-শান্তিতে ভরে থাকবে ঘর। কাঁচা বসত ঘর একদিন দালান হবে। এতটুকুই যাদের চাওয়া-পাওয়া সেই মা-বাবাই এখন থাকেন খোলা আকাশের নিচে। ইতোমধ্যে ছেলেকে পাওয়ার আশায় গ্রামের একটি মসজিদের জন্য পাঁচ কাঠা জমি দান করে দিয়েছেন।

নিখোঁজ সোহেলের মা বানু বেগম বলেন, ছোট কাল থেকে ছেলেটিকে দূরে কোথাও যেতে দেয়নি। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে। একমাত্র ছেলেই ছিল তাদের সব। শ্রী ধরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, তিলকপুর মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও তিলকপুর বাদশা হাজী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। খুবই ভাল ফলাফল করে প্রত্যেকটিতে। সেই ছেলে এভাবে হারিয়ে যাবে ভাবতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পড়াশুনার পাশাপাশি সোহেল বাবার কৃষি কাজে নিয়মিত সাহায্য করতো। বাবা অসুস্থ্য থাকলে অনেক সময় একাই সমস্ত জমিতে বীজ রোপন করে দিত। বড় বড় ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরতো। এতো সুন্দর বোধদয় যে ছেলের সেই ছেলে এভাবে মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে কখনোই বুঝতে পারেন নি হতভাগা এই মা-বাবা।

একদিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে চিৎকার -চেচামেচি করতে শুরু করে সোহেল। চিৎকার করার এক পর্যায়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় সোহেল। সেই দিন বাড়ি পাশে তিলকপুর বাজারে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার ঘরে ফিরে আসে। মা- বাবার সাথে অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর চোখ -মুখে আতংক এনে বলতে থাকে‘মাইকেল জ্যাকসন আমাকে নিয়ে যেতে চায়। আমাকে ধরতে চায়’। এভাবে কয়েকদিন চলতে থাকলে বাড়ির আশ-পাশের লোকজনের কাছে কৌতুল হতে থাকে সোহেলকে নিয়ে। সোহেলের এই খবর শোনার পর সহপাঠিরা বাড়িতে আসে তার খোঁজ নিতে। সোহেলের শোবার ঘর ভর্তি বই আর নোট খাতায়। সেদিন ঘরে বন্ধুরা খুঁেজ পায় তার ব্যবহৃত বেশ কিছুুৃ নোট খাতা। তার হাতের লেখায় পৃষ্ঠা পর পৃষ্ঠা ভরে গেছে। সব ইংরেজিতে। ইংরেজিত ভাল পারদর্শী ছিল সোহেল। বেশির ভাগ গান গল্প বলে জানান সোহেলের মা। এই অবস্থায় একদিন ঘরের জানালার পাশে বসে কোরবানির গরু জবাই করার ছুরি নিয়ে বলতে থাকে মাইকেল জ্যাকসন আসলে তাকে মেরে ফেলবে। মাইকেল জ্যাকসন তাকে মেরে ফেলতে চায়। পরে বাবা-মা তার কাছে গেলে দেখা গেছে চুপচাপ হয়ে যাচেছ।

নিখোঁজ সোহেলের বাবার আরও তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে। সোহেলের বাবা মেঝো। সংসারে একমাত্র ছেলে ও স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই এই জগতে। সোহেল হারিয়ে যাওয়া পর থেকে মা-বাবাকেই ছেলের সন্ধানে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে। তিনি ঘোষণা করেন তার ছেলেকে যদি কেউ খুজেঁ দেয় তাকে উপযুক্ত পুরষ্কৃত করবেন। প্রয়োজনে বাড়ির বাকি জায়গাটুকুও ছেলে জন্য দিয়ে দিবেন। যে ছেলেকে নিয়ে এতো স্বপ্ন সেই ছেলেই যদি না থাকে এই সম্পদ তাদের দরকার নাই বলেন সোহেলের মা-বাবা।

যোগাযোগের জন্য মা-বাবার ফোন নাম্বার দেওয়া হলো। মোবাইল নাম্বার ০১৯৩১-১৭৪৫২২। কোন সহৃদয়বান ব্যক্তি যদি তাদের ছেলের সন্ধান পেয়ে থাকেন তাহলে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েনে সোহেলের মা-বাবা।

সিটিজিনিউজ/এইচএম

সর্বশেষ সংবাদ


নোটিশ : “এই মাত্র পাওয়া” খবর আপনার মোবাইলে পেতে আপনার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন থেকে START পাঠিয়ে দিন 4848 নম্বরে ।
ctgnew
প্রধান উপদেষ্টা : আব্দুল গাফফার চৌধুরী
সম্পাদক : সোয়েব উদ্দিন কবির
ঠিকানা : ৯২ মোমিন রোড ,
শাহ আনিস মার্কেট ৫ম তলা, চট্রগ্রাম ।
মোবাইল : ০১৮১৬-৫৫৩৩৬৬
টিএন্ডটি : ০৩১-৬৩৬২০০

Design and Development by : Creative Workshop

49 queries in 1.027 seconds.