সেবা দিয়ে সেবা কেনেন টিবি রোগী চারুবালার স্বামী – Ctgnews
ctgnew

সেবা দিয়ে সেবা কেনেন টিবি রোগী চারুবালার স্বামী

 

সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বক্ষব্যধি হাসপাতাল। ইনসেটে হাসপাতালে ভর্তি টিবি রোগী চারাবালার স্বামী ক্যাশব দাস। — ছবি সিটিজিনিউজ 

সাফি-উল হাকিম :: মহান মে দিবসে এক্সক্লুসিভ কিছু করবো এমন চিন্তায় শহর উপশহরে ঘুরে বেড়িয়েছি। ক্যামেরা আর মোটরসাইকেল নিয়ে আগের দিনের পরিকল্পনা মত বের হই কাক ডাকা ভোরে।

সকাল তখন ৭টা। মোটরসাইকেল সোজা চলে গেছে বক্ষব্যধি হাসপাতালের বারান্দার সামনে। কি মনে করে প্রথমেই চলে যাই ওই হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায়। সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বাংলাবাজার এলাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস জিজিজেস (বিআইটিআইডি) জাতীয় ট্রপিক্যাল এবং সংক্রামক ব্যধি হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র খুবই স্পর্শকাতর জায়গা।

যেখানে মুখোশ খোলা যাবে না। সেখানে দেখলাম ঝড়ের বেগে চল্লিশোর্ধ বয়সী লোক ব্যাগ হাতে ওই বক্ষ ব্যাধি হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার টিবি রোগীদের ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আসছে।

হাতুরী, করাত, বাটাল, দা, প্লাস, শাবল হাতে লোকটি রোগীদের রুম থেকে বের হতে দেখে এগিয়ে যাই। ছবির কাজ সেরে ফেলি প্রথমে। পরে কথা বলি।

ক্যাশব দাস বক্ষব্যধি হাসপাতালে ভর্তি টিবি রোগী চারুবালা দাসের স্বামী। চারুবালা টিবি রোগে আক্রান্ত হয়ে ফৌজদারহাট বক্ষব্যধি হাসপাতালে ভর্তি আছেন দুইমাস ধরে।

কথা বলতেই ক্যাশব দাসের দুই চোখ ছল ছল করে উঠলো। দুই মাস হচ্ছে প্রায় তার স্ত্রী এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পরিবারের তিন মেয়ে একটি ছোট ছেলে রয়েছে তাদের। কিন্ত মেয়ে দুটির বিয়ে হয়ে গেছে, আরেকটি মেয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে। ছোট ছেলেটির বয়স ১২ বছর।

কাট্টলী এলাকায় সাগর পাড়ে নৌকা তৈরি করতেন। এখন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কাঁচাঘর মেরামত করেন, নতুন করে ঘর তৈরিও করে দেন কেউ চাইলে। এসব কাজ খুঁজে নিতে হয়। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলতে হয়। চেনা জানা যারা আছেন তারা মাঝে মধ্যে কাজ দেন। এভাবেই কোনভাবে চলতো কেশব দাসের পরিবার।

হঠাৎ স্ত্রী অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। বাড়ীতে রেখে কয়েকদিন চিকিৎসা চালালে রোগীর অবনতি হতে থাকে। পরে চিকিৎসকরা ফৌজদার বক্ষব্যধি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। এখানে ভর্তি করানোর পর চিকিৎসক ক্যাশব দাসকে নিশ্চিত করেন তার স্ত্রীর টিবি রোগ ধরা পড়েছে। সেই থেকে হাসপাতালে দুই মাস ধরে স্ত্রীর পাশে রয়েছেন ক্যাশব দাস।

ছন্দপতন ঘটে তার ঘর নির্মাণ কাজে। স্ত্রীর শরীরের অবস্থা খারাপ হতে থাকলে বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা। প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে যে ওষুধ দেওয়া হয় তার পরও তাকে দৈনিক কম করে হলেও ১০০টাকার ওষুধ কিনতে হয়। তার সাথে অন্যন্য খরচ তো আছেই।

 

আর বাড়ীতে যাওয়া হয় না। কাজ থেকে সরাসরি চলে আসেন স্ত্রীর সেবা করতে। রাতভর জেগে থাকেন। হাড়ভাঙ্গা খাটুনীর পর দেখা গেছে চোখের পাতা আর খোলা রাখতে পারেন না। নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েন স্ত্রী যে ওয়ার্ডে ভর্তি সে ওযার্ডের বাইরে হাসপাতালের ফ্লোরের উপর। মধ্যরাতে দেখা গেছে নার্স ডেকে পাঠাচ্ছে স্ত্রীর জন্য এই ওষুধটা লাগবে। এই জিনিসটা লাগবে। ছুটে যাচ্ছেন ফার্মেসীতে। এভাবেই ক্যাশব দাস দুই মাস ধরে স্ত্রীর সাথে হাসপাতালে। স্ত্রীকে রেখে এক পর্যায়ে বাইরে কাজের সন্ধানে না যেতে পেরে হতাশায় ঘুরতে থাকেন। দিশেহারা ক্যাশব হাসপাতালের ডাক্তার নার্সদের কাছে সাহায্য চান।

তার এই দুঃখ দেখে ডাক্তার নার্সদের কিছুটা মন গলে। তাকে দিয়ে ডাক্তার নার্সদের বিভিন্ন জিনিসপত্র আনান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফরমায়েশ দেন। পান থেকে চুন না খসে সমেত সেই ফরমায়েশ পালন করেন ক্যাশব দাস। এভাবে হাসপাতাল থেকে তার এক বেলা ভাত আর ১০-২০ টাকা আয় হয় । কখনও যদি বড় ধরনে কাজ করে দেন তাহলে ১০০-১৫০ টাকাও মিলে। বড় কাজ বলতে তাকে দিয়ে হাসপাতালের চারপাশের ড্রেন পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া হয়। কোন আসবাবপত্র ভাঙ্গা থাকলে মেরামত করিয়ে নেওয়া হয়। এই কাজের বিনিময়ে তাকে যে পারিশ্রমিক দেন ডাক্তার-নার্সরা তাতে তিনি খুশি হন। পারিশ্রমিক তার কম হলেও খুশির ভঙ্গীমা করে ডাক্তার নার্সদের মন জয় করার চেষ্টা করেন। যাতে অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি  ডাক্তার-নার্সরা চিকিৎসা সেবা করেন। পড়াশুনা না জানা সহজ-সরল ক্যাশব দাসেরতো টাকা দিয়ে সেবা কেনার সুযোগ নেই তাই সেবা দিয়ে সেবা কিনেন এই বক্ষব্যধি হাসপাতালে।

ক্যাশব দাসের ছোট ছেলে উজজ্বল দাসের বয়স মাত্র ১২ বছর। সে তার বোন পুতুল দাসের সাথে কাট্রলীতে থাকে। অপর দুই মেয়ে শাংখ রানী দাস ও স্বরসতি দাসের বিয়ে হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি হাসপাতালে ক্যাশব দাসের একটি ক্লিনারের চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তাহলে স্ত্রীর ওষুধ কেনার টাকার ব্যবস্থা হতো।

ক্যাশব দাসের স্ত্রীর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ক্যাশব দাসের স্ত্রী আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ্য। তবে আরো কয়েক মাস থাকতে হতে পারে। পুরোপুরি সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত এসব রোগীকে চিকিৎসকরা হাসপাতাল আঙ্গীনার বাহিরে যেতে নিষেধ করে থাকেন। এমনকি রোগটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় একেবারে বেশি প্রয়োজন না হলে আত্মীয়স্বজনদের ভিরতে দেন না।

———-
জেইউএস

সর্বশেষ সংবাদ


নোটিশ : “এই মাত্র পাওয়া” খবর আপনার মোবাইলে পেতে আপনার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন থেকে START পাঠিয়ে দিন 4848 নম্বরে ।
ctgnew
প্রধান উপদেষ্টা : আব্দুল গাফফার চৌধুরী
সম্পাদক : সোয়েব উদ্দিন কবির
ঠিকানা : ৯২ মোমিন রোড ,
শাহ আনিস মার্কেট ৫ম তলা, চট্রগ্রাম ।
মোবাইল : ০১৮১৬-৫৫৩৩৬৬
টিএন্ডটি : ০৩১-৬৩৬২০০

Design and Development by : Creative Workshop

50 queries in 1.564 seconds.