জন্মদিনের শুভেচ্ছা; মানবকল্যাণে সদা সোচ্চার শেখ হাসিনা

0

এ বছর এক অস্থির সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালিত হতে যাচ্ছে। যদিও তিনি তার বাবার মতই ঘটা করে জন্মদিন পালন করেন না, তবুও তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছা ঠিকই বইতে থাকে।

চলমান রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের প্রেক্ষাপটে এ বছর তার জন্মদিনের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি না হলেও বেশ খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একাত্তরের ওই দিনে বিক্ষুব্ধ বাঙালি পাকিস্তানের নির্মমতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছিলেন। সেদিন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার আবার জন্মদিন কী, মৃত্যুদিবসই বা কী? আমার জীবনই বা কী? মৃত্যুদিন আর জন্মদিন অতি গৌণভাবে এখানে অতিবাহিত হয়। আমার জনগণই আমার জীবন।’ সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবারে হয়তো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্টের কথাই তার জন্মদিনে বেশি করে মনে করবেন। ছেলের সঙ্গে নিভৃতে তিনি এ বছর তার জন্মদিন পালন করছেন। দলের নেতা ও কর্মীদের ঘটা করে তার জন্মদিন পালন করতে মানা করে দিয়েছেন।

এবারের সময়টাও বিক্ষুব্ধ। বিপন্ন মানবতার প্রেক্ষাপটে অস্থির এই সময়ে তিনি উদ্বিগ্ন। যদিও, এরই মধ্যে জগৎসভায় তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘিরে যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে- তা উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান নেতা তার কথা শুনেছেন এবং এই মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে খবর এসেছে যুক্তরাষ্ট্র  ও যুক্তরাজ্যসহ নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি সদস্য দেশ রোহিঙ্গা বিষয় নিয়ে বিশেষ একটি অধিবেশনের ডাক দিয়েছে। কয়েক দিন আগেও নিরাপত্তা পরিষদ এ বিষয়ে সর্বসম্মত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে (যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল) তারা নিয়মিতভাবে রাখাইন অঞ্চলে যে অগ্নিসংযোগ ঘটছে, মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে- সেসবের প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক কৌশলগত ফোরাম আইসিএসএফ ২৪ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারে চলমান ‘গণহত্যা’র নিন্দে জানিয়েছে এবং বিশ্বসম্প্রদায়কে রুখে দাঁড়াতে বলেছে।

বাংলাদেশ যেভাবে শরণার্থীদের সামলাচ্ছে তারও তারা প্রশংসা করেছেন। গণমাধ্যমগুলোও ইতিবাচক খবর ছাপছে। সর্বশেষ বিশ্বখ্যাত ‘দি ইকোনমিস্ট’ লিখেছে রুয়ান্ডার চেয়েও বেশি হারে রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিগত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে ঢুকেছে। আলজাজিরা, বিবিসি, সিএনএন, এনডিটিভি নিয়মিত খবর প্রকাশ করছে। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভি শরণার্থীদের কাদামাখা পায়ের ছবি দেখিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করেছে যে কী নিদারুণ কষ্ট করেই না শরণার্থীরা বাংলাদেশে এসেছে। নিজেদের সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এসব দুঃখী মানুষকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিচ্ছে। শুরুতে খানিকটা বিশৃংখলা থাকলেও এখন শরণার্থী শিবিরে শৃংখলা ও স্বস্তি ফিরে এসেছে। সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিয়েছে।

নানা দেশ থেকে ত্রাণ আসছে। কিন্তু বিদেশি ত্রাণের জন্য বাংলাদেশ বসে থাকেনি। মানবকল্যাণে উচ্চকণ্ঠ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছুটে গেছেন রোহিঙ্গা ত্রাণ শিবিরে। নিপীড়িত মায়েদের শিশুদের তিনি বুকে আগলে নিয়েছেন। ওইদিন বিদেশি এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধু কন্যাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “এই রোহিঙ্গাদের আপনি কতদিন রাখবেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “কতদিন? এরা সবাই মানুষ।” অন্য আরেক জনসমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের যা আছে তাই আমরা শরণার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে খাব। আর এ কারণেই  বন্ধুবর শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল হালে এক কলামে লিখেছেন, ‘পৃথিবীর সবাই লাভক্ষতির হিসাব করছে! আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী সেই লাভক্ষতির হিসাব করেননি, একেবারে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, তিনি মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার  শেষ নেই।’

শুধু জাফর ইকবাল কেন, যাদের জন্য তিনি দুঃসাহসী ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সূচনা করেছেন তাদের মুখেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোয় এক নজরকাড়া প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী কেন্দ্রে খাদিজা (২০) নামের এক তরুণী এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। ওই সন্তানের নাম রাখেন ‘শেখ হাসিনা’। খাদিজার মা আলুম বাহার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার সহানুভূতির কারণেই রাখাইন ছেড়ে আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয় পেয়েছে, বেঁচে আছে। এমনকি খাদিজার মেয়ে পৃথিবীর আলো-বাতাস পাচ্ছে শেখ হাসিনার কারণেই।’ খাদিজা আরও খানিকটা বিস্তারিতভাবে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্য পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমার থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে এসেছি। বাঁচার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে গেছি শুধু গর্ভের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার মেয়ের নাম ‘শেখ হাসিনা’ রেখেছি।’

স্বামী নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। মায়ের হাত ধরে এ দেশে এসেছেন খাদিজা। তার বাবাকেও হত্যা করা হয়েছে। নবজাতক ‘শেখ হাসিনা’ খাদিজা ও তার মায়ের ‘বেঁচে থাকার আশা’। তাকে পেয়ে তাদের সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। এখন ‘শেখ হাসিনা’র জন্যই তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় খাদিজা ও তার মায়ের এই কৃতজ্ঞতাবোধকেই তার অনানুষ্ঠানিক জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে গ্রহণ করবেন।

‘দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করছে ওদের’ শিরোনামে ২৩ সেপ্টেম্বরের ‘দৈনিক সমকালে’র এক প্রতিবেদনেও মোহাম্মদ উল্লাহ ও তার স্ত্রী দিলারা বেগম, সব হারিয়ে দুঃখী জুলেখার (৪৮) বারে বারে আত্মহত্যা করার চেষ্টাসহ মিয়ানমার সরকারের নানা নিষ্ঠুরতার বর্ণনা ফুটে উঠেছে। শরণার্থীদের এমন লাখো দুঃখগাথা শুনে আমরা অবাক হইনি। আমার বিশ্বাস, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অবাক হননি। তিনিও সব হারিয়ে পঁচাত্তরে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ছয় বছর ধরে পরদেশে এক অনিশ্চিত জীবন অতিবাহিত করেছেন। একাত্তরে এক কোটিরও বেশি মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কয়েক লাখ শরণার্থী রোগ-শোকে প্রাণ দিয়েছেন ওই শিবিরেই। তাই হঠাৎ করে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুঃখ আমরা বুঝি। সে কারণেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন -এদের দুঃখ মোচনের জন্য। এদের মাতৃভূমিতে ফেরত নেয়ার জন্য তিনি বিশ্বসভায় আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘে দেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের গুরুত্ব মনে হয় অনেকেই অনুধাবন করতে পারছেন। কফি আনন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নসহ তিনি সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাব রাখেন। নিরাপত্তা পরিষদের সাত সদস্য যাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে, এরই মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিবকে এক বিশেষ অধিবেশনে পুরো রোহিঙ্গা সংকটটি ব্যাখ্যা করতে আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনার (ইউএনএইচ সিআর) শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে বলেছেন, রাখাইনে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে এবং শরণার্থীদের ফেরত নিতে হবে। যুক্তরাজ্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটেও মিয়ানমারের মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে কথা চালাচালি শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে মিয়ানমার সেনাপ্রধানকে টেলিফোনে সন্ত্রাস বন্ধের আহ্বান করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক’দিন আগে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছেন। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ প্রশ্নে যথেষ্ট সোচ্চার। এই বাস্তবতায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বাংলাদেশের  পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা করেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় আলাপ শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর অং সাং সুচি সুর নরম করে শরণার্থী ফেরত নেয়ার কথা বলছেন। তবে তাতে যাচাই-বাছাইয়ের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। একদিকে মিয়ানমারের ওপর বিশ্ব নেতাদের চাপ বাড়ছে অন্যদিকে রাখাইনে এখনও আগুন জ্বলছে। তাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই। তবে আশার কথা, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বিশ্ববাসী সাড়া দিতে শুরু করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে একটি জাতির নিধনের কথা যেমন বলেছেন তেমনি আবার শান্তির আবাস অঞ্চল গড়ার আহ্বানও করেছেন। তিনি বরাবরই শান্তির পক্ষে তার অবস্থান বজায় রেখেছেন। তার দেয়া শান্তির মডেল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়েছে। পেছনে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে উন্নয়নের আবর্তে এনে সার্বজনীন শান্তি স্থাপনে তিনি বিশ্বাসী। রোহিঙ্গা সংকটের কিছুদিন আগে তিনি উত্তরবঙ্গে বানভাসি মানুষদের সাহস দিয়ে বলেছেন, একজন মানুষও বন্যার কারণে অভুক্ত থাকবেন না। সেইমতো তিনি বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ-তৎপরতা জোরদার করেছেন। জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের পর পরই তিনি নিইয়র্কে বাংলাদেশ মিশন অফিসে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি ওআইসি কনটাক্ট গ্রুপের সঙ্গে রোহিঙ্গা বিষয়ে তার যে আলাপ সে কথা বলার পাশাপাশি ১৯৯৮ সালে বানভাসি মানুষদের কীভাবে রক্ষা করেছেন- সে কথাও খুব জোর দিয়ে বলেছেন। সে সময় অনেকেই আশংকা করেছিলেন যে ওই বন্যায় দু’কোটি মানুষের প্রাণ যেতে পারে। কিন্তু তার বিচক্ষণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিকৌশল বাস্তবায়নের ফলে একজন মানুষও না খেয়ে মরেননি।

এ বছরও বন্যার্তদের পুনর্বাসন তার সরকার সাহসিকতার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে দুর্যোগের শিকার মানুষগুলো ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। কৃষি পুনর্বাসনের কাজ বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে চালের সরবরাহে খানিকটা ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। খুব দ্রুতই চালের আমদানি বাড়াতে শুল্ক কমিয়ে ফেলা, খোলা বাজারে চাল বিক্রি এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করে ধীরে ধীরে চালের দাম কমিয়ে এনে তা স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চালের দাম এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে।

এ সবকিছুই করা হচ্ছে মানবকল্যাণের পক্ষে তার সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের আগ্রহের কারণে। একটু গভীরভাবে যদি তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের দিকে তাকান- তাহলেই বুঝতে পারবেন তিনি বরাবরই পিছিয়েপড়া মানুষদের পক্ষে। তার আমলে নেয়া ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, এমডিজি ও এসডিজি বাস্তবায়নের নীতি কৌশল, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের স্বার্থে কৃষক, ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যে প্রয়োজনীয় ঋণ দেয়ার উদ্ভাবনীমূলক কর্মসূচি গ্রহণে তার যে অনুপ্রেরণা আমরা (কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা) পেয়েছি, তাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জনকল্যাণী ভাবনার প্রতিফলন লাভ করেছি।

দক্ষিণ বাংলায় জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে দারিদ্র্য বেড়েছে। আর সে কারণে নিজ অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহসী পদক্ষেপ নিতে তিনি দ্বিধা করেননি। সামান্য পিছপা হননি। কেননা তিনি জানেন, এই সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণ বাংলায় শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। আর তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ওপর পড়বে।

এবারে জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে তিনি সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার কথাও বলেছেন। হোলি আর্টিজানের মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার পর যখন পুরো জাতির মনোবল ভেঙে গিয়েছিল, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন তখন তিনি দশ হাতে এই মানবতার শত্রুদের দমনে নেমে পড়েন। আর কে না জানেন ধর্মীয় উগ্রবাদী এই সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ কতটা সফল। সব মিলিয়ে তিনি আজ আমাদের শুধু জাতীয় নেতাই নন, বিশ্ব নেতাও বটে।

‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে ক্রমেই তিনি নিয়ে যাচ্ছেন অনন্য উচ্চতায় এবং বিশ্বে তিনি নন্দিতও হচ্ছেন সেইভাবে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন তার নানামুখী দূরদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।’ (মুস্তাফা নূরুল ইসলাম, গণতন্ত্রের বহ্নিশিখা শেখ হাসিনা, ২০১৬, পৃ. ২১)।

একই সুরে প্রবীণ সাংবাদিক, সাহিত্যিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী ওই একই প্রকাশনায় লিখেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, হাসিনার শাসনামল একদিন অতীতের হোসেনশাহী শাসনামলের মতো বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে সংযুক্ত হবে।’ (ঐ, পৃ. ৩৩)।

সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের মতে, ‘শেখ হাসিনা একইসঙ্গে বজ্রের মতো কঠিন-কঠোর ও ফুলের মতো কোমল নেত্রী। তিনি পিতৃ-মাতৃহীন শিশু, বঞ্চিত শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে যেমন কেঁদে আকুল হন, তেমনি মানবতাবিরোধী গণহত্যাকারীরা, তার চেনামানুষ হলেও, তারা যখন তাদের কৃত-অপরাধের জন্য যোগ্য শাস্তি পায়, তখন তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ে তা অনুমোদন করেন।’ (ঐ,পৃ. ১৮১)। ‘গণতন্ত্রের বহ্নিশিখা শেখ হাসিনা’ বইটিতে এ দেশের প্রধান প্রধান চিন্তকরা লিখেছেন, আমি লিখেছি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতি কৌশল বিষয়ে। এই অল্প পরিসরে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরতে আমি অক্ষম। শেষ করছি একজন পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর অত্যন্ত সফল এক কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের অনুভূতির কথা তুলে ধরে।

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় সার্ক লিটারারি ফেস্টিভ্যাল; উদ্বোধন করেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। চট্টগ্রামে যারা সমুদ্রে মাছ ধরে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন হরিশংকর জলদাস তার ‘দহনকাল’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসকে জীবনমুখী সাহিত্য উল্লেখ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, ‘এই উপন্যাসটি পড়ে আমি অনেক কিছু বুঝেছি, অনেক কিছু জেনেছি। এ কথা শুনে হরিশংকর শিহরিত হয়ে ওঠেন। তাই তিনি লিখেছেন, “বর্ণহীন আমি। প্রান্ত সমাজে আমার জন্ম। চারপাশের মর্যাদাবান সমাজের মানুষরা সর্বদা আমাদের কানের কাছে বলে গেছে ব্রাত্য তোরা, মন্ত্রহীন। তোদের লেখাপড়ার অধিকার নেই। তোরা মাছ ধরবি আর মাছ বেঁচবি। কিল-গুঁতাঘুষিই তোদের জন্য উপহার। … সেই অন্ধকারের মানুষটির সম্পর্কে শেখ হাসিনার একি উচ্চারণ। এরকম মূল্যায়ন আমার! সেই সময় নতুন করে আমার বাঁচবার ইচ্ছা জাগল। … আমরা ব্রাত্য নই, ঘৃণারও নই। … বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ভালোবাসেন। আমার মতো অতি সাধারণ একজন মানুষের উপন্যাস পড়ে তিনি আপ্লুত হন; আবৃত হন। (পৃ. ৩১৪-১৫, হরিশংকর জলদাস)।

আর এভাবেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়ে যান মমতাময়ী এবং মানবকল্যাণে ব্রতী এক অনন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি তার মানবকল্যাণী নীতি ও কর্মকাণ্ডের জন্যে ইন্দিরাগান্ধী শান্তি পুরস্কার, জাতিসংঘের আইসিটি পুরস্কার, ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার, প্ল্যানেট ফিফ্টি ফিফ্টি পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রবক্তা শেখ হাসিনার বিশ্বমঞ্চে সরব উপস্থিতি সবারই চোখে পড়ছে। আমরা প্রত্যাশা করি, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আরও অনেকটাই পথ পাড়ি দেবেন। শান্তি অন্বেষায় তার এই অভিযাত্রা সফল হোক। তার জন্মদিন শুভ হোক।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Share.

Leave A Reply