ওষুধ প্রতিরোধী আরও ১২ জীবাণু শনাক্ত

0 87

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ই-কোলাই ও ব্যাকটেরিয়া জাতীয় জীবাণু ক্রমেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। যক্ষ্মা ছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে এমন আরও ১২টি বিভিন্ন ধরনের জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে। এসব জীবাণুতে আক্রান্তদের শরীরে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেও যথাযথ ফল পাওয়া যাচ্ছেন না। ফলে বছরে আড়াই লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের পরও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এ তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, যত্রতত্র গড়ে ওঠা ওষুধের দোকানে ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি এবং চিকিৎসক ও রোগীদের সচেতনতার অভাবে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে বিভিন্ন জীবাণু। এভাবে চলতে থাকলে অদূরভবিষ্যতে এমন দিন আসবে, যখন খুব সাধারণ রোগব্যাধিতেও মানুষের মৃত্যু ঘটবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বে এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ডেভেলপ (উন্নয়ন) হয়নি। অন্যদিকে চলছে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। ফলে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বিশ্ব। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে, চারপাশে অসংখ্য ওষুধ থাকবে; কিন্তু জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হওয়ায় কোনো ওষুধই কাজে আসবে না।
২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বর্তমানে ক্লিনিক্যাল পাইপলাইনে রয়েছে এমন বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা ক্ষেত্রে শুধু স্বল্পমেয়াদি সমাধান দিতে পারে, যা যক্ষ্মাসহ এ ধরনের রোগের প্রতি বড় হুমকি। কারণ প্রতিবছর প্রায় ২৫০ হাজার মানুষের এসব রোগে মৃত্যু হয়।
প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেডরোস অ্যাডহানম গবেব্রিসাস বলেন, ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি, যা আধুনিক ওষুধের অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলছে। তিনি যক্ষ্মাসহ ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের গবেষণা এবং উন্নয়নে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের জন্য এটি সবচেয়ে জরুরি। অন্যথায় আমাদের এমন সময়ে যেতে হবে, যখন সাধারণ সংক্রমণের এবং ছোটখাটো অস্ত্রোপচারে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা ছাড়াও আরও ১২টি বিভিন্ন ধরনের জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে। যার মধ্যে নিউমোনিয়া বা মূত্রনালির সংক্রমণের মতো সাধারণ সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণুও রয়েছে, যা বিদ্যমান অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি ক্রমবর্ধমানভাবে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে নতুন চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ছে। প্রতিবেদনটিতে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুগুলোর মধ্যে সবক’টির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে ৫১টি নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক উদ্ভাবিত, যা বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলোয় অতিরিক্ত মান যোগ করবে। তবে যক্ষ্মা, ই-কোলাইয়ের মতো মারাত্মক সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোর চিকিৎসায় কম বিকল্পই আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি ওষুধ বিভাগের পরিচালক ড. সুজান্নে হিল বলেন, গবেষক এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু গুরুতর সংক্রমণের বিরুদ্ধে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে মনোনিবেশ করতে হবে। তবে এ হুমকি মোকাবেলা করতে ও অবহেলিত রোগের চিকিৎসা ও গবেষণায় গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ স্থাপন করা হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য এ কাজের জন্য ৫৬ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টিউবারকুলোসিস প্রোগ্রামের পরিচালক ড. মারিও রাভিলিওন বলেন, যক্ষ্মার জন্য গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় মাত্র দুটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে এসেছে। এক্ষেত্রে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন। সেজন্য বছরে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করলেই হবে না। সেসঙ্গে বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার বজায় রাখতে কাজ করতে হবে। এছাড়া মানুষ, পশু এবং কৃষি ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয় নির্দেশিকাও প্রস্তুত করতে হবে।
সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায়ও একই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইম্যুনোলজি বিভাগের প্রধান ড. দিলরুবা আহমেদ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এ গবেষণা পরিচালনা করছেন। গবেষণার প্রয়োজনে তিনি এ পর্যন্ত এক লক্ষাধিক রক্তের নমুনা পর্যবেক্ষণ করেছেন। যাতে তিনি জীবাণুর উপস্থিতি এবং এসব জীবাণুর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। দেখা গেছে, এসব রক্তের নমুনায় জীবাণু ব্যাপক মাত্রায় ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে গবেষণায় প্রাপ্ত এসব ফল বিএমসি জার্নাল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কনট্রোলে প্রকাশিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. একে লুৎফুল কবির যুগান্তরকে বলেন, রোগ-জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হওয়ার জন্য আমরাই দায়ী। এজন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, যত্রতত্র গড়ে ওঠা ওষুধের দোকান থেকে ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা হয়। আবার রোগীরাও চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বলেন, এমন ওষুধ দেন যেন একদিনেই সুস্থ হয়ে উঠি। আবার অনেকে আছেন যারা সামান্য সর্দিজ্বরে ইচ্ছেমতো এজিথ্রোমাইসিনের মতো চূড়ান্ত পর্যায়ের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.