বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রম কমছে মা-বাবার প্রতি ভালবাসা!

0

সাফি-উল হাকিম :: বৃদ্ধাশ্রম যারা বানাচ্ছেন তা কারা? তারা কি ভিন্ন গ্রহের কেউ! তাদেরও তো মা-বাবা রয়েছেন।তারাও তো একদিন মা-বাবা হবেন। তবে কেন তাদের এই বৃদ্ধাশ্রম বানানোর প্রতি আগ্রহ। নাকি সামাজিক সেবার আড়ালে সন্তানের কাছ থেকে মা-বাবাকে দূরে সরে নেওয়া একটি কৌশল।একটি বিকৃত পারিবারিক সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করা।  তাই আজ বিশ্ব প্রবীণ দিবসের প্রশ্ন সচেতন মানুষের বৃদ্ধাশ্রম বাড়ালেও মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, পারিবারিক দায়বদ্ধতা কেন বাড়াতে পারছেন না এসব সংগঠন?

বিশ্ব প্রবীণ দিবস আজ (১ অক্টোবর)। নাগরিক কর্মব্যস্ততা, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বড় বাসা-অ্যাপার্টমেন্টের সংকট, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবসহ নানা কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অনেক প্রবীণই ঘর ছাড়ছেন।
কেউ স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমের নির্বাসন-জীবন। কারও জীবনে আবার নচিকেতার গানটিই সত্য,

অনিচ্ছায় ঠাঁই নিতে হচ্ছে আশ্রমে। সময়ের প্রয়োজনে, ভালোবাসার ফেরিওয়ালাদের চেষ্টায় একের পর এক গড়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম। এসব বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোক্তারা চান হৃদয়ভাঙা আশ্রয়হীন মানুষগুলোকে এতটুকু শান্তি, নিরাপত্তা দিতে।

তেমনি ধারাবাহিকতায় রাউজানে আরেকটি বৃদ্ধাশ্রম হচ্ছে। লায়নিজমের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে চলতি মাসেই ১০ তলা ভবনের আধুনিক এ বৃদ্ধাশ্রমের নির্মাণকাজ শুরু হবে।

এর আগে ২০১৪ সালের ১ মে দক্ষিণ রাউজানের নোয়াপাড়ায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কসংলগ্ন বিশাল এলাকাজুড়ে ‘আমেনা-বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। ব্যবসায়ী মো. শামসুল আলম মা-বাবার নামে এ বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকার ১১ নারী ও ১১ পুরুষ এ কেন্দ্রে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাচ্ছেন।

নতুন বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে লায়ন্স ক্লাবের (জেলা ৩১৫, বি-৪) গভর্নর মোহাম্মদ মনজুর আলম মঞ্জু বলেন, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী বৃদ্ধাশ্রমটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবে। আমাদের সাবেক জেলা গভর্নর, বিশিষ্ট শিল্পপতি লায়ন রূপম কিশোর বড়ুয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় এ বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করা হবে।

জেলা গভর্নর বলেন, এ বৃদ্ধাশ্রমটি হবে প্রবীণদের জন্য স্বর্গপুরি। বিশ্বমানের দৃষ্টিনন্দন ১০ তলা ভবন হবে। সেখানে থাকবে অত্যাধুনিক সব আসবাব, ফিটিংস, লাইব্রেরি বা পাঠ কক্ষ, বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক, প্রার্থনা ঘর, কিচেন, ডাইনিং ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা এখানে ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল থাকবে। যেখানে সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে।

চারতলা ভবনের আমেনা-বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফারুক জানান, মাত্র সাতজন বয়স্ক মানুষকে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে এ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ২২ জন আছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য পাঁচজন কর্মচারী আছেন। পুনর্বাসিতদের পুষ্টিচাহিদা অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয়।।

বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কমবেশি আমাদের সবার ভেতরই আছে। আমরা সবাই বাবা-মাকে ভালোবেসে সুখ পাই। মনের গহিণে আনন্দ অনুভব করি। মমতাময়ী মায়ের আঁচলই আমাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। বাবা-মা আমাদের নিজের জীবনের রক্তবিন্দু দিয়ে তিল তিল করে বড় করে তুলেছেন। শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মা ১০ মাস কষ্ট সহ্য করে আমাদের গর্ভে ধারণ করে চিরঋণী করেছেন। সেই ঋণ শোধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তো কবি বলেছেন, মায়ের একধার দুধের দাম/কাটিয়া গায়ের চাম/ পাপস বানাইলেও ঋণ শোধ হবে না/এমন দরদী ভবে কেউ হবে না আমার মা…..।

সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের যে ভালোবাসা, তা পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সন্তানের জন্য বাবা-মা নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুন্ঠাবোধ করেন না। তাই তাদেরকে সম্মান করা, ভালোবাসা ও তাদের প্রতি কর্তব্য পালন করা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তিক্ত সত্য হলো, কালপরিক্রমায় আমরা হয়ে উঠি অতি নিমর্ম। প্রকাশ পায় বাবা-মায়ের প্রতি চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা। বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তারা সন্তানের উপার্জনের ওপর নির্ভশীল ও চরম অসহায় হয়ে পড়েন। আর তখন থেকেই আমরা তাদের প্রতি প্রদর্শন করি ঔদাসিন্য ও অবহেলা। তাদেরকে ভাবতে থাক পরিবারের বোঝাস্বরপ। এই ভোগবাদী মানসিকতা থেকেই আমরা তাদেরকে জোর করে পাঠিয়ে দেই বৃদ্ধাশ্রমে। স্বামী-স্ত্রী ও আদরের ছেলে-মেয়ে নিয়ে গড়ে ওঠে সুখের সংসার। আর বৃদ্দ বাবা-মায়ের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। পরিবার-পরিজন, ছেলে-মেয়ে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক চরম অসহায় জীবনযাপন করেন তারা। ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিহাস, যে সন্তানকে মানুষ করার জন্য বাবা-মা সারা জীবন কষ্ট করেছেন, যে সন্তানের সুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই নরাধম সন্তানের দ্বারাই বাবা-মা নিগৃহীত হচ্ছেন।

আমরা একবারও ভাবি না যে, আমাদের সন্তান আমাদের কাছে যেমন, আমরাও আমাদের বাবা-মায়ের কাছে তেমন। আমরা আমাদের সন্তানকে যেমন আদর-সোহাগ করি, মায়া-মমতা দিয়ে পরম যত্নে লালন-পালন করি, আমাদের বাবা-মাও আমাদের মায়া-মমতা দিয়ে, আদর -স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন। বাবা-মা নিজে না খেয়ে আমাদের খাইয়েছেন। নিজের সুখ-শান্তি বিসজর্ন দিয়ে আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। আমাদের সুখের দিকে তাকিয়ে তারা আরামের ঘুম হারাম করেছেন। আামদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। আমদের লালন-পালনে কষ্ট মনে করে কোনো শিশু আশ্রমে আমাদের পাঠিয়ে দেননি।

ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সেবা-যত্ন করা, তাদের সঙ্গে সদাচারণ করার নিদের্শ দেয়া হয়েছে। তাদের কথা মান্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজ। বাবা-মাকে কষ্ট দেয়া, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, তাদের কথা অমান্য করা নিঃসন্দেহ অনেক বড় গুনাহ। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে’ (সুরা বনি ইসরাইল:২৩)।

হাদিস শরীফে এসেছে, একবার জনৈক সাহাবি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে জিহাদে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার বাবা-মা কেউ কি জীবিত আছে, সাহাবি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাড়িতে গিয়ে তাদের সেবা কর। (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ২৮৪২)

অন্য হাদিসে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার বাবা-মা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে পেল, অথচ সে জান্নাত আদায় করতে পারল না, তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে?’ বাবা-মা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের প্রতি দায়-দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়, তাদের সেবা –শুশ্রুসা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মানুষ যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয় তখন সে আবার শৈশবে ফিরে যায়।

বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক সেক্সপিয়র বার্ধক্যকে আখ্যায়িত করেছেন দ্বিতীয় শৈশব হিসেবে। তাই তখন তার বেঁচে থাকার জন্য শিশুকালের মতো আদর-স্নেহ, মায়া-মমতার প্রয়োজন হয়। বার্ধক্যের কারণে বাবা-মায়ের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে ধরণের হয়ে যেতে পারে, সামান্য বিষয় নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতে পারেন। তাই তাদের অস্বাভাবিক আচরণকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার নিদের্শ রয়েছে ইসলামে। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের একজন বা উভয়েই জীবদ্দশয়ায় বাধর্ক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না। তাদেরকে ধমক দিও না, তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। (সুরা বনি ইসরাইল- ২৩)

সন্তানের জন্য বাবা-মা উভয়েই কষ্ট করেন। তথাপি বাবার তুলনায় মায়ের হক অনেক বেশি। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ব্যক্তি আমার সর্বাধিক সদাচরণ পাওয়ার অধিকারী? তিনি বলেন, তোমার মা। লোকটি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বললন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমরা মা।’ লোকটি বললন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। (মুসলিম শরিফ)।

এদিকে এই বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে মতানৈক্য প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তাদের ভাষ্যমতে, বৃদ্ধাশ্রম থাকলে সেখানে বৃদ্ধা মা-বাবাকে পাঠাতে সন্তানরা আগ্রহী হবে। সেটা রীতিনীতে পরিণত হবে। সংস্কৃতিতে পরিণত হবে। একটি উচ্চ মার্গীয় শিক্ষিত গোষ্ঠি সু-কৌশলে এই বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করে সন্তানদের কাছ থেকে মা-বাবাকে সরিয়ে নেওয়ার অপকৌশলে লিপ্ত রয়েছে।  দিনে দিনে বৃদ্ধাশ্রম বাড়লেও বাড়েনি মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা। শেষ বয়সে এসে বৃদ্ধ মা-বাবাকে একসাথে থাকার পারিবারিক দায়বদ্ধতা। । তাই বৃদ্ধাশ্রম নয় সবাইকে কঠোর হতে হবে মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে কিভাবে থাকা যায় সে রীতিনীতি চালু করা।প্রয়োজনে দেশে আইন চালু করার যেতে পারে। যে আইনে বাধ্যতামূলক থাকবে মা-বাবাকে এক সঙ্গে রাখার ।

 

সিটিজিনিউজ/এইচএম

 

Share.

Leave A Reply