‘ভাসান জালের ফাঁন্দে আটকাইতে চাইনা, বিহুন্দি জাল বাপ-দাদাদের আশীর্বাদ’

0

শাওন আজহার   ::  পৃথিবীতে যত ধরণের পেশা রয়েছে সামুদ্রিক জেলেদের মাছ ধরার পেশাটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের জেলেরাও এর ব্যাতিক্রম নয়।

প্রায় সনাতন পদ্ধতিতে নৌকা ও জালকে সম্বল করে জেলেরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে তাদের পূর্ব পুরুষের সময়কাল হতে।জেলেদের দুঃখ-দুর্দশা সীমাহীন । নানারকম প্রতিকূলতা হতে শুরু করে সৃষ্ট আর্থিক দৈন্যতা তাদের অনেকাংশে থামিয়ে দেয়।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র উপকূল হতে শুরু করে সীতাকুন্ডের গা ঘেঁষে বেশ কিছু জেলে পল্লী দেখা যায়। সামুদ্রিক জেলেদের বিশাল এক অংশ এখানে বসবাস করে আসছে।

প্রায় সাড়ে চার হাজারের মত জেলে পরিবার এসকল পল্লীগুলোতে বসবাস করে।জেলেদের মাছ ধরার মূল বাহন নৌকা বা ইঞ্জিনের বোট হলেও জালের ক্ষেত্রে তারা ‘বেহুন্দি’ বা খুঁটি জাল ব্যবহার করে আসছে তাদের পূর্ব-পুরুষের সময়কাল হতে।

খুঁটি বা ‘বেহুন্দি’ জালের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তর চট্টলা মৎস্যজীবি জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি লিটন দাস সিটিজি নিউজকে বলেন ‘ভাসান জালের ফাঁন্দে আটকায়তে চাইনা, বিহুন্দি জাল আমাদের বাপ-দাদাদের আশীর্বাদ ’।তিনি আরো জানান, সরকার ভাসমান জাল ব্যবহার করতে আমাদেরকে বলেছেন , কিন্তু আমরা এ জাল ব্যবহারে অভ্যস্থ না । তাছাড়া, ভাসমান জালে যদি মাছ ধরতে হয় তাহলে আমাদের খরচ প্রায় দ্বি-গুণ পড়ে যায়,এছাড়াও খুঁটি বা ‘বিহন্দি’ জাল ব্যবহার করে আমরা আমাদের সীমানানুযায়ী কোন প্রকার ভেদাভেদ ছাড়ায় গরিব-ধনীরা যার যার মতো ব্যবসা করে যেতে পারি।

ভাসমান ও খুঁটি জালের খরচের পার্থক্য কেমন এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলেদের প্রতিনিধিরা বলেন ‘ খুঁটি জাল আমাদের পূর্ব-পুরুষের খুঁটি আমরা সেই পূর্ব-পুরুষের সময়কাল হতে খুঁটি বা বেহুন্দি জালে মাছ ধরে আসছি।’
খুঁটি জাল ব্যবহারে একটি বোটে মাছ ধরতে তিন থেকে চারজন লোক লাগে এবং সবকিছু মিলিয়ে খরচ পড়ে মাসে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অন্যদিকে ভাসান জাল ব্যবহার করলে এক বোটে লোক লাগবে তেরো থেকে চৌদ্দ জন। সবকিছু মিলিয়ে মাসিক প্রায় দশ লক্ষ টাকার মত খরচ পরে। অন্যান্য সমস্যাতো আছেই।
তাদের দাবি হলো ভাসান জালে সব ধরণের মাছ ধরা যায় না , যা `বেহুন্দি’ জালে ধরা যায়।

বৃদ্ধ জেলে লোলিত মোহন দাস বলে ওঠে ‘ ভাসান জালে আমাদের ফাঁস খাওয়ার কোন স্বাদ নাই’ বিহন্দি জালই আমাদের সম্বল। ’কোন এক স্বার্থন্বেষী মহল আমাদের ক্ষতি করতে চাইছে। যা বুঝতে পারলেও আমাদের অজানা।’

জেলেদের অন্যতম আরেকটি সমস্যা হলো ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় নিষেদাজ্ঞা । পূর্বে এগারো দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও বর্তমানে বাইশদিন করা হয়েছে যা ইলিশ মাছের প্রজনন সময়কালে হয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে লিটন দাস বলেন ‘ ইলিশ মাছ ধরার মৌসুম মাত্র তিনমাস , তাছাড়া মা ইলিশের ডিম ছাড়তে সর্বোচ্চ পাঁচদিন সময় লাগে।

এরপরও আমাদের দাবি হলো মাছ ধরায় সরকারী নিষেদাজ্ঞা যদি সর্বোচ্চ পনেরদিন করে তাহলে , আমরা সাচ্ছন্দে মাছ ধরতে পারি। কারণ, আশ্বিন মাস, পূর্ণিমা ও অম্যাবসার ওপর মাছের ‘জো’ মানে মাছ ধরার সময় বহন করে।বাইশদিন বন্ধের প্রেক্ষিতে আমাদেরকে যে বিশ কেজি চাল দেওয়া হয় , তা দিয়ে আমাদের পরিবার চলেনা। তাছাড়া চাউলগুলোর মানও ভালো নয়।

২০১৫-১৬ সালে প্রায় ঊনত্রিশ হাজার জেলেদের নিবন্ধন করা হলেও এর মধ্যে মাত্র দুই হাজার একশ জন জেলে চাল পায় বলে অভিযোগ তাদের।নানারকম সমস্যার কথা জেলে পল্লীর জেলেরা সিটিজি নিউজের কাছে তুলে ধরে। তাদের দাবি সরকার তাদের সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে তাদের নানাসমস্যা ও দুর্দশার কথা অনুধাবন করতে পারবে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মোমিনুল হকের সাথে সিটিজি নিউজের সাক্ষাৎকারে তিনি জানান , খুঁটি বা ‌‌‌‌‌ ‌‌বিহুন্দি’ জাল দিয়ে মাছ ধরা জেলেদের আদি পেশা হলেও এ জাল ব্যবহারে নানারকম সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। পতেঙ্গা থেকে শুরু করে উত্তরের সীতাকুন্ড বা এর পরবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নৌ-বাহিনীর চ্যানেল রুট থাকায় জাহাজ চলাচলে সৃষ্টি হয় প্রতিবন্ধকতা।’

নৌ-বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরকে বার বার তাগিদ দিতে থাকলে , ‘বেহুন্দি’ জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধের সিদ্বান্ত প্রক্রিয়াধীন , এরপরেও আইনে যদি কোন সমাধান থাকে আমরা সে অনুযায়ী আইন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিব। ’ ইলিশ মাছ ধরায় নিষেদাজ্ঞা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান ‘‘ মা ইলিশ মাছ প্রজনন মৌসুমে ডিম ছেড়ে ফিরে আসতে প্রায় বাইশ দিন বা এর অধিক সময় লাগে। সে প্রেক্ষিতে জেলেদের নূন্যতম বাইশদিন মাছ ধরার উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।’’তাছাড়া তিনি জানান সংসদে যে নিষেদাজ্ঞা জারি করা হয়েছে , সে ক্ষেত্রে সরকার আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিবে।

উল্লেখ্য গত প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ ধরা বন্ধের যে সময় প্রতিবছর নির্ধারণ করা হয় তা কমানোর দাবিসহ সাত দফা দাবিতে একটি স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পোঁছানোর জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে দিয়েছেন তারা।

দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো খুঁটি জাল বসানোর বিরদ্ধে যে আইন তা পরিবর্তন ও সংশোধন করা , টং জাল , বিহুন্দি জাল নিষিদ্ধের যে আইন তা পরিবর্তন ও সংশোধন করা। অন্যান্য সমস্যাগুলোও তারা তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ণকে তার স্বাগত জানায়।

সিটিজিনিউজ / এসএ

 

Share.

Leave A Reply