কোচিং বাণিজ্যে ঢাকার ২৪ স্কুলের ৫২২ শিক্ষক

0
22

নিউজ ডেস্ক::রাজধানীর নামিদামি স্কুলগুলোতে ভর্তি ও শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বাণিজ্যের মাধ্যমে ২৪টি স্কুলের ৫২২ শিক্ষক কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেন।

দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকা এসব শিক্ষকের বদলির সুপারিশ করেছে দুদক। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি দাখিল করেছে এ বিষয়ে অনুসন্ধান টিম।

কমিশনের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ টিম অনুসন্ধান শেষে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব ভট্টাচার্য এই তথ্য জানিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দুদক।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবেদনটি কমিশনের কর্মকর্তা পর্যায়ে জমা হয়েছে বলে শুনেছি। এখনো কমিশন পর্যায়ে আসেনি। কমিশনে উপস্থাপিত হলে কমিশন পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা নিয়ে কারো ছিনিমিনি করার অধিকার নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। ’ তিনি বলেন, ‘ঢাকায় প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে সুরম্য ভবন রয়েছে; বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে যাচ্ছে; অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ রয়েছে; আমাদের মেধাবী শিক্ষকগণ রয়েছেন; তার পরও কেন শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কোচিং সেন্টারে চলে যাচ্ছে? শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা শ্রেণিকক্ষেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুদকের প্রতিবেদনটি এখনো আমাদের হাতে পৌঁছেনি। হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখব। তবে কোচিং বাণিজ্যের বিষয়ে আমরাও খুব কঠোর। ’

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, সরকারি নীতিমালা মোতাবেক শিক্ষকদের এক কর্মস্থলে তিন বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেই তাঁদের অন্যত্র বদলি করার নির্দেশনা রয়েছে।

শিক্ষকদের বদলি না করার পেছনে রাজনৈতিক চাপ, তদবির ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেন রয়েছে উল্লেখ করে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছুসংখ্যক শিক্ষক কোচিং বা প্রাইভেট বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বছরের পর বছর ঢাকার একই বিদ্যালয়ে অবস্থান করছেন।

২৪ স্কুলের ৫২২ শিক্ষক : গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ৩২ জন, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৬ জন, ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলের ১৭ জন, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪ জন, শেরেবাংলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৭ জন, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত হাই স্কুলের ২৫ জন, খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩১ জন, তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২১ জন, গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪ জন, মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ জন, নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ জন, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩১ জন, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের ২৯ জন, আরমানিটোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ২১ জন, ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুলের ৯ জন, ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আটজন, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩২ জন, বাংলাবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২২ জন, টিকাটুলী কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ জন, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৮ জন, শেরেবাংলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪ জন, ধানমণ্ডি কামরুন্নেছা সরকারি বিদ্যালয়ের সাতজন, ধানমণ্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ জন ও নিউ গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলের সাতজনের বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের প্রমাণ পেয়েছে দুদকের অনুসন্ধান টিম।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে প্রাইভেট পড়ানোর কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। এই ২৪টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫২২ জন শিক্ষক ১০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩৩ বছর পর্যন্ত একই বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। এ সকল শিক্ষককে সরকারি নীতিমালা/নির্দেশিকা অনুসারে বদলি করা হয়নি বা হচ্ছে না। ’

শিক্ষকদের তদবির করে একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সরকারি নীতিমালা মোতাবেক একই কর্মস্থলে তিন বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেই অন্যত্র বদলি করার নির্দেশনা রয়েছে। এই বদলি না করার মূলে রয়েছে চাপ প্রয়োগ, তদবির ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেন। কিছুসংখ্যক শিক্ষক কোচিং বা প্রাইভেট বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বছরের পর বছর ঢাকার একই বিদ্যালয়ে অবস্থান করছেন। একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর থাকার ফলে এই শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়ানোর নামে কোচিং বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যাতে ছাত্রছাত্রীরা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়। ’

প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইংরেজি শিক্ষক বা গণিত শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ইংরেজি বা গণিতের শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এগুলো সমন্বয় করা হচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে কোচিং বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট।

এ প্রেক্ষাপটে প্রাইভেট বা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার লক্ষ্যে প্রতিবেদনে কতিপয় সুপারিশ করা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে দুদক। তবে দুদক কোনো মামলা করবে না।

 

সিটিজিনিউজ/মাসুদ শেখ

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here