সাতই নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা

0

নিউজ ডেস্ক::১৯৭৫ সালের সাতই নভেম্বরে অভ্যুত্থান ছিল ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব। আজকে যখন শেখ হাসিনা সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতের আধিপত্য চরমে পৌঁছেছে, তখন সাতই নভেম্বরের চেতনার প্রাসঙ্গিকতা বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যেসব জাতীয়তাবাদী নেতা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জাতীয় স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই স্বাধীনতা-উত্তরকালে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখানে নেহরু, সুকর্ন, নাসেরের কথা প্রথমেই মনে আসে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সরকারের পতন অনেকটা প্রত্যাশিত মনে হয়।

ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যে শাসক হিসেবে তার ব্যর্থতা ফুটে উঠতে থাকে। অর্থনৈতিক এই ব্যর্থতা চরমে আসে। শেখ মুজিব সব শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করেন। এসব কারখানায় নিয়োগ দেয়া হয় অনভিজ্ঞ আওয়ামী লীগ নেতাদের। এদের অনেকে শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ভারতে পাচার করে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে যান। পশ্চিম পাকিস্তানি ও বিহারিদের পরিত্যক্ত প্রায় ৬০ হাজার বাড়িঘর আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। দেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ লিখেন, ‘দুর্নীতি কোনো নতুন জিনিস নয়। কিন্তু ঢাকায় যে দুর্নীতি হয়েছিল তার পরিধি ও চরিত্র ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।’ জেলা ও থানা পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের আওয়ামী লীগ কর্মীদের অধীনস্থ করা হয়। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং খুনখারাবি দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়।

সরকারের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব ও সিরাজুল আলম খান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করেন। এ দল অল্প সময়ের মধ্যে ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কর্তৃত্ববাদী শাসক শেখ মুজিব কোনো বিরোধী দল সহ্য করতে পারতেন না। তখন সর্বাত্মক একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হন। তিনি তার রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্টে শাসনতন্ত্রের সংশোধনী বিল আনেন। এই বিল পাসের সময় সাংবাদিক ও অতিথির উপস্থিতি নিষেধ করা হয়। শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও তার মন্ত্রিসভার সদস্য সেরনিয়াবাতের বিশেষ সুপারিশক্রমে আমি ও আমার সহকর্মী ড. শামসুল হুদা ভিজিটরস গ্যালারিতে উপস্থিত থাকার সুযোগ লাভ করি। পার্লামেন্টের বিধান লঙ্ঘন করে একবার মাত্র রিডিংয়ের পর শাসনতন্ত্রের সংশোধন বিল মাত্র আধা ঘণ্টার কম সময়ে শেখ মুজিবের ঘোষিত হুইপের ফলে প্রায় সর্বসম্মতিভাবে পাস হয়। মাত্র দু’জন সংসদ সদস্য এই বিল পাসের মৌখিক প্রতিবাদ জানান।

এই বিল সব রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি সাধন করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে। নতুন দলের নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক দল বা বাকশাল। শেখ মুজিব বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমলে না নিয়ে বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে যান। পরে ২০টি সংবাদপত্রের মধ্যে চারটি সংবাদপত্র চালু রাখা হয়। এসব কারণে জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে থাকে। এ ছাড়া তিনি ভারতের সাথে বন্ধুত্ব ‘চিরস্থায়ী’ রাখার কথা বলে প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় আধিপত্য বলয়ে চলে যান। ভারতের সাথে ২৫ বছরব্যাপী ‘বন্ধুত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন, যা সচেতন নাগরিকেরা দাসখত বলে অভিহিত করেন।

ক্ষমতা গ্রহণ করার পর তার প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায় শেখ মুজিব ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের স্তুতিগান করে শুরু করতে থাকেন। আওয়ামী লীগ নেতারা এমনকি শেখ মুজিবের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ভারতের সাথে চোরাচালানিতে যুক্ত হন। ভারতে খাদ্যশস্য চোরাচালানি হওয়ায় সৃষ্ট ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে ভারতপ্রীতি নীতির ফল বলে মনে করা হয়। কোনো রকম বাছবিচার না করে শেখ মুজিব ইন্দিরা গান্ধীকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সম্মতি দেন। পক্ষান্তরে পাকিস্তান সরকার অনেক দিন পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধ চালুর অনুমতি দেয়া থেকে বিরত থাকে।

ভারতের সাহায্যে ও অস্ত্রে রক্ষীবাহিনী গঠন করে শেখ মুজিব তার পতন ত্বরান্বিত করেন। রক্ষীবাহিনীর হাতে বহু বিরোধীদলীয় কর্মী ও নেতা আহত ও নিহত হন। জনগণ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহ করতে থাকেন রক্ষীবাহিনী ও ভারতের সমর্থনে শেখ মুজিব আজীবন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছেন ও বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করছেন। রাজনীতি-সচেতন অনেকেই তখন বলতে থাকেন- ‘পিন্ডির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে দিল্লির শাসনে আসার জন্য বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করে নাই।’ এই মাত্রাতিরিক্ত ভারতপ্রীতির কারণে তার জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর চারজন মেজর বিপ্লব ঘটান এবং শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। এই অকস্মাৎ ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থক ন্যাপ মস্কোপন্থী হতভম্ব হয়ে পড়ে। তারা কোনো রকম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মৌন সমর্থন নিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর প্রতিবিপ্লব ঘটান। তিনি খন্দকার মোশতাক আহমদকে সরিয়ে দিয়ে জাস্টিস সায়েমকে প্রেসিডেন্ট পদে বসান। সামরিক বাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়ে যান। ভারতীয় বেতার ও পত্রপত্রিকায় খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানকে মহা উল্লাসে সমর্থন জানানো হয়।
কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক খালেদ মোশাররফের মায়ের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে শেখ মুজিবের বাসস্থান পর্যন্ত যান। খালেদ মোশাররফের এসব কর্মকাণ্ডে দেশের জনগণ এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এসব তৎপরতাকে বাংলাদেশ আবার ভারতীয় আধিপত্যবাদের অধীনে চলে যাওয়ার আলামত হিসেবে দেখে।

৭ নভেম্বর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। নিহত হন খালেদ মোশাররফ। এ সময় সাধারণ সৈনিকদের জিয়াউর রহমানকে কাঁধে নিয়ে মিছিল করার দৃশ্য দেখা যায়। সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এই কাজে ঢাকা শহরের সর্বশ্রেণীর লোক উল্লাসে ফেটে পড়ে। সৈনিকদের সাথে নিয়ে তারা ঢাকায় মিছিল বের করে স্লোগান দেয়- বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, সিপাহি-জনতা কেন জিয়াউর রহমানকে তাদের সর্বসম্মত নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন আদর্শ সৈনিক। সেই পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈনিক হিসেবে খেমকারান সেক্টরে অংশগ্রহণ করেন। আইয়ুব খানের পতনের এক সাক্ষাৎকারে এই লেখকের কাছে আইয়ুব খান কাশ্মির যুদ্ধে বাংলাদেশ ইউনিটের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এই যুদ্ধের সময় থেকে জিয়াউর রহমান বাঙালি সৈনিকদের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। এখন প্রশ্ন ওঠে, সিপাহি-জনতা কেন জিয়াউর রহমানকে নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন- জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন আদর্শ সৈনিক।

একজন আদর্শ সৈনিকের গুণ হলো নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ সর্বোপরি দেশপ্রেম। জিয়াউর রহমান এ সব গুণে গুণান্বিত ছিলেন। জিয়াউর রহমান তার স্ত্রী-পুত্রদের বিপদে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি চরম দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। এসব কারণে সৈনিকদের ও দেশের আপামর জনগণের মধ্যে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ কারণে তিনি হতে পেরেছিলেন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মহানায়ক।

সিপাহি বিপ্লবের সময় কর্নেল তাহের একটি গোপন বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার স্লোগান হয়- সিপাহিরা ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই। তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ৪০ জন অফিসার হত্যা করে। আমি শুনেছি, অফিসারদের স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের জীবনরক্ষার জন্য জিয়াউর রহমানের কাছে আকুল আবেদন জানান। জিয়াউর রহমান কঠোরহস্তে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ড দমন করে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। খালেদ মোশাররফের ভারতের আধিপত্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

এখন সাতই নভেম্বরের মতো আধিপত্যবিরোধী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করতে পারে। অনেকেই আশা করেন, আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এমন একটি বিপ্লব সংঘটিত হবে। ব্যালটের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রেমী জনগণ সাতই নভেম্বরের বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।

সিটিজিনি্উজ/মাসুদ শেখ

Share.

Leave A Reply