আমাদের প্রিয় তসলিম ভাই

0

সৈয়দ উমর ফারুক :: বড় কষ্টের বিদায় ছিল তসলিম ভাইয়ের। শেষ ক’বছর নাকে টিউব লাগিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে তাঁকে জীবন ধারণ করতে হয়েছে। একজন আধুনিক মানবিক এবং শৈল্পিক মূল্যবোধের মানুষ স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী বুধবার নীরবে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

তসলিম ভাই মূলত : আমার মেজ মামা মাসুদ উল আলমের বন্ধু ছিলেন। একজন কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র অন্যজন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। আমি যখন সেভেনে পড়ছি তখন থেকেই তসলিম ভাইয়ের সাথে পরিচয়। এটি সত্তুর সালের কথা। সবাই তাকে সিগনেট প্রেসের মালিকের ছেলে বলে বেশি সমীহ করতেন। মাসুদ মামার সুবাধে কলেজিয়েট স্কুলের ঐ বয়সী ছেলেদের সাথে তার ভাল বন্ধুত্বও গড়ে ওঠেছিল। সদরুল পাশা, মঈন ভাই, আসিফ ভাই, পাহাড়ী ভাই- এরা ছিল কলেজিয়েটের ছাত্র অথচ তসলিম ভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু।

পরবর্তীতে আসিফ ভাইয়ের বোনকে তিনি বিয়ে করেন। হেলো চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে আমার সহপাঠি।
তসলিম ভাইয়ের সে সময়কার বড় সখ ছিল ফটোগ্রাফী এবং ক্রিকেট খেলা দেখা। যখনি এফ.সি.সি থেকে ছুটি মিলত তিনি আর দেরী না করেই তাঁর বন্ধু মাসুদের কাজির দেউড়ির আলমবাগে ছুটে আসতেন। কবি ওহীদুল আলমের টিন শেডের বৈঠক খানায় তসলিম ভাই ঢুকেই বলতেন ‘মাউফ্ফা কডে’। বন্ধু মাসুদের ডাক নাম ‘মাউফ্ফা’। কাঁধে নতুন ব্র্যান্ডের ইয়াসিকা ক্যামেরা। তারুণ্যে টকবগে, আধুনিক পোষাক-পরিচ্ছদে দেখে মনে হতো তিনি ‘বড় লোকের ছেলে’। তবে আচার-আচরণে সাদামাটা। বয়সে অনেক ছোট হলেও তাদের সাথে আমাদের জাম্পেস আড্ডা ছিল। বিশেষ করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের কাছ থেকে শিখেছি টেবিল টেনিস এবং ২৯ খেলা (একটি একধরণের বিনোদনমূলক তাস খেলা)। সে সময় তরুণরা প্রায় ঘরের ভেতর বসে এসব খেলে সময় কাটাত। সে সময় তাঁর নেশা হয়ে ওঠেছিল ছবি তোলা।

স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামে গড়ে ওঠল ব্যান্ড গ্র“প সুরেলা। সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের বাসায় তাঁর ছোট ছেলে সাজেদ উল আলমের চেষ্টায় সুরেলা শিল্পী গোষ্ঠি গড়ে ওঠে। সে সময় আমরা দেখলাম হারমোনিয়াম তবলার বদলে ইলেক্ট্রিক গীটার, ড্রাম, একডিয়ান, কংগো, বংগো। বন্ধু মাসুদের সূত্রে তাঁর সাথে পরিচয় হয়ে গেল সাজেদের সাথে। সংস্কৃতিমনা তসলিম ভাই’র এবার আনাগোনা শুরু হলো সাজেদের বাসা ‘আল’মীন’এ। আমাদের বাসাও সেখানে। এখানে প্রতিদিন গানের মহড়া হয়। আর এতে যুক্ত হয় সে সময়কার সদ্য স্বাধীন দেশের এক ঝাঁক গান পাগল তরুণ। সুরেলা সুর ওঠেছিলো।

সংস্কৃতিপ্রেমিদের ঠিকানা : সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো তসলিম ভাই সবার জ্যৈষ্ঠ হলেও সুরেলার কনিষ্ঠদের সাথে তাঁর নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেছিল এবং এক সময় এই শিল্পী গোষ্ঠি নাম বদলিয়ে ‘সোলস’ হলে তসলিম ভাই সে দলের অন্যতম লিডার মনোনীত হন। একজন সুদর্শন, আধুনিক স্মার্ট এবং বন্ধু বৎসল হওয়ায় তসলিম ভাই দ্রুত এই দলের একজন অপরিহার্য অভিভাবক হয়ে ওঠেছিলেন।

মাসুদ মামার বিয়ের আসর হয়েছিল সিলেটের মৌলভীবাজারে। কাজির দেউড়ি থেকে দু’টি বড় বাসে করে আমরা বরযাত্রী হয়েছিলাম। তসলিম ভাইও আমাদের সাথে যাত্রী হয়েছিলেন। রাতে সিলেট পৌঁছে সবার জন্য নির্ধারিত রুম ঠিক হলেও আমরা ক’জন বয়সে নবীন হওয়ায় রুমের বাইরে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে বিয়ের আসরে যখন তসলিম ভাই ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন তখন আমরা ভোজ সেরে হোটেলে তাঁর রুমটা দখল করে ঘুমিয়ে পড়লাম। প্রায় ভোর হয় অবস্থা তখন বন্ধু মাসুদকে সাথে নিয়ে হোটেলে চলে এলেন। কিন্তু তাঁর রুম ভেতর থেকে বন্ধ। এতে একপ্রকার উচ্চকণ্ঠে ডাকাডাকি করে শেষ পর্যন্ত অন্য রুমে ঢুকে ঘুমিয়ে ছিলেন তসলিম ভাই। এ নিয়ে পুরোদিন অভিমানে কাটলেও ফিরতি যাত্রায় বাসের আনন্দ উল্লাসে তিনি আমাদের সাথী হয়েছিলেন।

সিগনেট প্রেস, নিউজ ফ্রন্ট- চট্টগ্রামের সুশীল সমাজের কাছে বড়ই প্রিয় নাম। ভাল ছাপার কথা ওঠলে চলো সিগনেট, ভাল বই পেতে হলে যাও নিউজফ্রন্টে। এদুটো প্রতিষ্ঠানের পেছনে চট্টলদরদীখ্যাত ইউসুফ চৌধুরীর অবদান সর্বজনবিদিত। পরবর্তীতে তিনিই দৈনিক পূর্বকোণ প্রকাশ করে সংবাদপত্র জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

তসলিম ভাই প্রয়াত পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরী হয়েছিলেন। সংবাদপত্র শিল্পকে আধুনিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং মানবতাবাদী হিসাবে গড়ে তুলতে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক চট্টগ্রামের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সংকট উত্তরণে যখনই ডাক দিয়েছেন তখনই আমরা সাড়া দিয়ে নিবিড় আলোচনায় বসেছি। তসলিম ভাই প্রতিটি সভায় গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। একজন স্থপতি হয়েও তিনি কীভাবে সংবাদপত্রকে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হবে সে কৌশলে তিনি আমাদের জানাতেন। শুধু তা-ই নয়, নব-নির্বাচিত মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চেয়ে যে বৈঠক করেছিলেন সেখানে তসলিম ভাইয়ের পরামর্শগুলো আধুনিক নগরী গড়ার কাজে অনেক বেশি সহায়ক হচ্ছে।

আজ তসলিম ভাই নেই, একথা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, তাঁর মেধা, মনন, বৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা আমাদের সংবাদপত্রের উন্নয়নে অনেক বেশি উপযোগী ছিল। তাঁর সম্পাদিত পূর্বকোণ মানুষের কল্যাণে সুস্থ জাতি গঠনে যেমন অবদান রেখেছে, ভবিষ্যতেও রাখবে- এটিই প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন, আমিন।

সিটিজিনিউজ/এইচএম 

Share.

Leave A Reply