বহুল প্রতীক্ষিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধন

0

বহুল প্রতীক্ষিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করলো পরমাণু বিশ্বে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য গৌরব ও আনন্দের।

বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল নির্মাণ কাজের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, এ স্বপ্ন শুরু হয়েছিলো ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে। জমি অধিগ্রহণসহ বেশি কিছু কাজ সম্পন্ন হলেও পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দেন। এ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন ড. ওয়াজেদ মিয়া। বঙ্গবন্ধু মাঝে-মধ্যে তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করা য়ায় কী-না এ নিয়ে তাকে বকাঝকা করতেন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা জাতির জনককে হত্যার পর এ কাজ আর এগোয়নি। পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন জটিল এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ২১ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা এ উদ্যোগ নেয়নি। ১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যক্রম হাতে নিই।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ২০০৯ সালে আমরা আবার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। এসময় বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’র (আইএইএ) গাইডলাইন অক্ষরে-অক্ষরে অনুসরণ করছি। আইএইএ সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষায় প্রতিটি স্তরের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। যেকোনো দুর্যোগে আমাদের বিদ্যুতকেন্দ্রে কোনো প্রকার দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেটি খেয়াল রেখা এ প্লান্টের ডিজাইন করা হয়েছে। পরিবেশ ও মানুষের যাতেক্ষতি না হয়, তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

যেকোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে দুশ্চিন্তার কারণ ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ অপসারণ ব্যবস্থাপনা। রাশিয়ার সঙ্গে এসব বর্জ ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। যারা এটা (বর্জ অপসারণ) নিয়ে দুশ্চিন্তা করে তাদের থেকে দেশপ্রেম আমার কম, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ দেশকে সেই দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যে দেশের স্বপ্ন জাতির জনক দেখেছিলেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী বর্জব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাশিয়ার স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশন- রোসাটমের সঙ্গে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে আমি যখন কথা বলি, প্রথমেই বলেছিলাম বর্জটা নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশ ঘনবসতির দেশ, বর্জ এখানে রাখা সম্ভব না। তারা বর্জ নিয়ে যেতে রাজি হয়। এ বিষয়ে একটি চুক্তিও হয়েছে।

‘আমি বলবো এটা নিয়ে যারা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন, টকশো-তে কথা বলছেন তারা তারা দুশ্চিন্তা ভুলে যান। ভালো কিছু চিন্তা করেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবেই’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে ১-২-৩ স্তরগুলোতে যারা থাকবেন, সেসব বাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

একটা ব্যাপার ছিল। আমি যখন রাশিয়া যাই তখন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলাপ করি, তিনি রাজি হন। পুতিন বলেছেন, রাশিয়া এটা করে দিবে। এজন্য আমি রাশিয়া ও প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে রাশিয়া ও সেদেশের জনগণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের অবদান স্মরণ করছি আজ।

তিনি আরও বলেন, জাতির পিতার মেতা বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পেয়েছিলাম বলেই আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। কিন্তু জাতির পিতা মাত্র সাড়ে ৩ বছর দেশকে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। বক্তব্য রাখেন রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ প্রমুখ।

এর আগে সকাল ১০টা ৫০মিনিটে হেলিকপ্টারে করে রূপপুরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। এরপর সকাল ১১টায় তিনি এ কাজের উদ্বোধন করেন।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে ১ হাজার ৬০ একর জমির উপর এ বিদ্যু‍ৎকেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে।

এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পরমাণু ক্লাবে (নিউক্লিয়ার নেশন) যুক্ত হবে। বাংলাদেশ হবে এ ক্লাবের ৩২তম দেশ। বর্তমানে বিশ্বের ৩১টি দেশে ৪৫০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট চালু রয়েছে।

রাশিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, আর্থিক সহায়তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হতে যাচ্ছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এএসই গ্রুপ অব কোম্পানিজ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণে সরবরাহ করছে রাশিয়া। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ‘ভিভিইআর ১২০০’ প্রযুক্তির পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করা হবে।

সিটিজিনিউজ/এইচএম 

Share.

Leave A Reply