‘ক্ষমতার মোহ একচুলও স্পর্শ করেনি তাঁকে’

0 22

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৪৪ এর পহেলা ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম। পিতার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরী আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেঝ সন্তান ছিলেন। পিতা চাকুরী করতেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে। পিতার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পরাশুনা করেছেন মাইজদী জেলা স্কুল, কাজেম আলি ইংলিশ হাই, আর চট্টগ্রামে প্রবর্তক সংঘে। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পরেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে।

মাধ্যমিত শেষে বাবার আদেশে ভর্তি হয়ে ছিলেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোর্সে। সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তি হন সরকারী চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, আর শেষমেষ সিটি কলেজ। সিটি কলেজেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের হাতেখরি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৪৪ থেকে ২০১৭ সাল ৭৩ বছরের একটি বিশাল ইতিহাস। এবিএম মহিউদ্দিন এ ইতিহাসের স্তম্ভ।

রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাক বাহিনির কাছে গ্রেফতার হন অসংখ্যবার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে আই এস আইয়ের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমী সদরদপ্তরের কাছে গ্রেফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চার মাস। পাক বাহিনির নির্যাতনের চিহ্ন মহিউদ্দীন আজও তার শরিরে বয়ে বেরাচ্ছেন। তার গ্রেফতারের খবরে ততদিনে ভারতের একটি মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শহীদ মহিউদ্দীন ক্যাম্প খোলা হয়েছিলো। বেচে থাকার কথা ছিলোনা তাঁর। শহীদ ভেবে বাবা ছেলের নামে দিয়ে ছিলো ফাতেহা। এরি মাঝে একদিন মানসিক রোগীর নাটক করে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে পালিয়ে বের হন মহিউদ্দিন। পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষন শেষে সক্রিয়ভাবে সম্মুখসমরে অংশ নেন। ছিলেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধিনে।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পরেন নতুন সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দীন। কিন্তু তৎকালিন সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালি হয়েও ক্ষমতার মোহ একচুলও স্পর্শ করেনি তাঁকে।

কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পরা থেকে বেচে যান, মৃত্যু বরন করেন সাথী মৌলভি সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে প্রতিবিপ্লবীদের সাথে যোগ দেন। লক্ষ্য সামরিক জান্তা, খুনি মোশতাককে সামরিক ভাবেই পরাস্ত করা। কিছুদিন পরেই দলের নির্দেশে পন্থা পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনিতিতে।

দেশে এসেই একের পর এক হুলিয়া। সামরিক বাহিনীর হাতে নিষ্পেষন, নির্যাতন, আর একের পর এক কারাভোগ। পরে জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে গোপন ষড়যন্ত্রের ভুমিকা প্রতিবাদি করে তোলে মহিউদ্দিনকে। দলের নির্দেশে চলে বৈপ্লবিক প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। তরুন ছাত্রনেতা মহিউদ্দিনের জুজুতে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা তটস্থ। মাঝে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়ে উঠলো। বঙ্গবন্ধু কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুমিকাকে নগণ্য করতে তাকে ঠেকাতে শত্রুরা উঠেপরে বসলো। অদম্য সাহসী মহিউদ্দীন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে দলবল নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার জন্য ঝাঁপিয়ে পরেন। সব বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনাকে দলের কান্ডারীর দায়ীত্ব নিতে সহয়তা করেন।

তারপর আসলো স্বৈরাচারি সামরিক সরকার এরশাদ। তারই শাসনামলে চট্টগ্রামে স্বয়ং জাস্তা প্রধানকে অবাঞ্চিত ঘোষনা করে চক্ষুশূল হন সরকারের। ফলে আবারও রাজনৈতিক বন্দি। ততদিনে চট্টগ্রামের আপামর জনতার নয়নমনি হয়ে উঠেন মহিউদ্দীন চৌধুরী।

পরবর্তীতে নব্বইয়ের গনআন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা রেখে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির অন্যতম সুপুরুষ বলে বিবাচিত হন সর্ব মহলে। রাজাকার আর সাম্প্রদায়ীক শক্তিকে ক্রমাগত পরাস্থ করে, একানব্বইয়ের ঘুর্নিঝড়ে দুস্থ জনতার পাশে দারিয়ে, অসহযোগ আন্দোলনে খালেদার সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, গরিব-দুঃখি-শ্রমিকের অধিকারের কথা বলে মহিরুহে পরিনত হন আজকের মহিউদ্দীন।

এতকিছুর পরও থেমে থাকেননি এই উদ্যমী জননেতা। গনমানুষের তথা চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রমাগত ছুটে চলেছেন। উপেক্ষা করেছেন রক্তচক্ষু। চালিয়ে গেছেন উন্নয়নের চাকা। উড়িয়ে চলেছেন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতি আর মুল্যবোধের পতাকা।

সর্বশেষ নির্যাতিত হন রাজনিতি পরিশোধনের নামে নেমে আশা সামরিক শকুনের ওয়ান ইলেভেনের শাসনামলে। ষাটোর্ধ বয়সে কারান্তরীন ছিলেন দীর্ঘ দুই বছর। এরমধ্যেই নির্মম ভাবে ইন্তেকাল করেন আদরের মেয়ে ফওজিয়া সুলতানা টুম্পা। নানান টালবাহানা করে টুম্পাকে মৃত্যু অবধারিত জেনেও দেখতে দেয়নি অনির্বাচিত সরকার নামক আরেক নব্য সামরিক জান্তা। শতচেষ্টা আর মানসিক নির্যাতন করেও টলাতে পারেনা সরকার মহিউদ্দীনকে একটুও। দুর্নীতিবাজদের সাথে এক করেও পারেনি দোষী সাব্যস্ত করতে। বারবার তারা পরাজিত হয়েছে এই সংগ্রামী মানুষের পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের কাছে।

জনগনের ভোটে তিন তিন বারের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মহিউদ্দীন। জনতার রায়ে, তাদের ভালবাসায় স্নিগ্ধ হয়েছেন বার বার। গনমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, শত কষ্ট, বেদনা, অসুস্থতায় ভুগে, নির্যাতন সহ্য করে, পরিবার পরিজনকে সময়-অসময়ে, ঘটনা-দুর্ঘটনায় হারানো এই মানুষটি আজ সবাইকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিল এ চট্টল সারদ।

সিটিজিনিউজ/এইচএম 

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.