চশমাহিলে শোকে কাতর হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা

0
27

চশমাহিলে এসে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন প্রধানমমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৩৫ মিনিট নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসভবনে অবস্থানকালে পুরো সময় জুড়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন, চট্টল বীরের স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন, দুই সন্তান মহিবুল হাসান চৌধুরী ও বোরহানুল হাসান চৌধুরী সালেহীন এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীর জামাতা ডা.সেলিম আক্তার। চশমাহিলেই কুলখানিতে পদদলিত হয়ে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের হাতে পাঁচ লাখ টাকা করে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় সদ্য প্রয়াত নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানান।

চশমাহিলের বাসায় প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৩৫ মিনিট অবস্থান করেন। মহিউদ্দিনের বাসা ত্যাগের আগে প্রধানমন্ত্রী ওই বাসায় অপেক্ষমান নিহতদের স্বজনদের কাছে যান। প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিহতদের স্বজনরা। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন।

হাসিনা মহিউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- যারা মারা গেছেন তাদের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া তো আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নিহতদের জন্য আমি সামান্য সাহায্য এনেছি। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে দিয়েছেন।

পদদলনের শিকার হয়ে নিহত প্রকৌশলী সত্যব্রত ভট্টাচার্যের স্ত্রী প্রিয়াংকা শর্মা প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দিনের বাসভবন ত্যাগের পরেও কান্না থামছিল না প্রিয়াংকার।

এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, আমার অর্থ সহায়তার দরকার নেই। আমাকে কলেজে একটি চাকরি দিলে খুবই ভালো হবে। আমার দুই ছেলেকে মানুষ করার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চাকরি চেয়েছি।

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা প্রিয়াংকা  বলেন, আমি খুব অসহায়। এমন কেউ নেই যে আমাকে দেখবে। আমার বাচ্চাগুলোকে মানুষ করার জন্য একটা চাকরি আমার খুবই প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা নগর আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক জহরলাল হাজারী  বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রিয়াংকাকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। এসময় তিনি প্রিয়াংকার বায়োডাটা জমা নেওয়ার জন্য নওফেল ভাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

গত ১৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনাবসান ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর মহিউদ্দিনের কুলখানিতে তার পরিবার নগরীর বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের আয়োজন করে। কুলখানিতে নগরীর এস এস খালেদ সড়কে রীমা কমিউনিটি সেন্টারে পদদলিত হয়ে দশজনের মৃত্যু হয়। আহত হন ২৫জন।

মহিউদ্দিনের বাসায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য গৃহায়ন ও গণপূর্মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী ড.হাছান মাহমুদ, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী, উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ছিলেন।

মহিউদ্দিনের বাসা থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গাড়িবহর সরাসরি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান।

ছিয়াশির পর আবারও চশমা হিলে প্রধানমন্ত্রী: 

১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারবিরোধী ‘আন্দোলনের নেত্রী’ শেখ হাসিনা একবার এসেছিলেন ‘চট্টগ্রামের আন্দোলনের নেতা’ মহিউদ্দিনের চশমাহিলের বাড়িতে। ৩১ বছর পর আরেকবার এলেন শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে। মহিউদ্দিন নেই, ঘুমিয়ে আছেন বাড়ির পাশে মাটিতে।নিরব সেই বাড়িতে ঢোকার সময়ই আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই টিনের ছাউনি দেওয়া যে ঘরটিতে বসে মহিউদ্দিন সঙ্গ দিতেন নেতাকর্মীদের, সেই ঘরেই প্রথম পা পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ঘরটির দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে মহিউদ্দিনের স্মৃতি। উদ্দাম তারুণ্যে বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে বসে থাকা মহিউদ্দিন। আন্দোলন-সংগ্রামে হাসিনার পাশে থাকা রাজপথ কাঁপানো নেতা মহিউদ্দিন। জনতার ভালোবাসায় সিক্ত মহিউদ্দিন। সব, সব স্মৃতি ফ্রেমে বন্দি হয়ে ঠাঁই নিয়েছে দেয়ালে।

প্রধানমন্ত্রী ঘরটিতে ঢুকেই সেই স্মৃতিগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন আর বারবার চোখ মুছেন। স্মৃতিকাতর হয়ে প্রধানমন্ত্রী বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

মহিউদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছবিগুলো সব দেখেছেন। তিনি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। আমাকে বললেন-কত স্মৃতি ! উনার (মহিউদ্দিন) মত মাটি থেকে উঠে আসা একজন নেতা চলে গেলেন। রাজনীতির জন্য অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। পার্টির জন্যও ক্ষতি, দেশের জন্যও ক্ষতি।

মহিউদ্দিনের জামাতা ডা.সেলিম আক্তার  বলেন, ছবিগুলো দেখার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বারবার চোখ মুছতে দেখেছি। তিনি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পঁচাত্তর পরবর্তী ভূমিকার কথা বলেছেন। চট্টগ্রামে পার্টিকে পুন:সংগঠিত করার ক্ষেত্রে উনার (মহিউদ্দিন) অবদান অনেক বেশি।

নওফেল  জানান, বসার কক্ষ থেকে নওফেল প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মহিউদ্দিনের শোবার কক্ষে যান। সঙ্গে তার মা হাসিনা মহিউদ্দিনও ছিলেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এসময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, নেত্রী-এটা মহিউদ্দিনের বেডরুম হলেও জনগণের অবাধ যাতায়াত ছিল। এই বেডরুম থেকেই মহিউদ্দিন সব আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু কি আন্দোলন-সংগ্রাম ! এই চট্টগ্রামের উন্নয়ন তো মহিউদ্দিন ভাই শুরু করেছিলেন। উনি মেয়র হওয়ার পর উনার হাত দিয়েই উন্নয়নের শুরু হয়েছে।

মহিউদ্দিনের বাসা ত্যাগের আগে নওফেল ও সালেহীনকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন হাসিনা মহিউদ্দিন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, নেত্রী আপনিই এখন এদের অভিভাবক। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ-আমিই ওদের অভিভাবক।

হাসিনা মহিউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন-উনি আমাদের পাশে থাকবেন। উনি আমাদের পরিবারের অভিভাবক।

মহিউদ্দিনের বাসায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য গৃহায়ন ও গণপূর্মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী ড.হাছান মাহমুদ, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী, উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ছিলেন।

মহিউদ্দিনের বাসা থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গাড়িবহর সরাসরি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান।

সিটিজিনিউজ/এইচএম 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here