অমর একুশে

0

শাওন আজহার  ::   ‘রক্তে রঞ্জিত একুশে তুমি, করেছো বাঙালিকে ঋণী’  আমরি বাংলা ভাষা করেছো মোরে ধন্য । বাংলা ভাষা প্রাপ্তির পেছনে ইতিহাস পর্যালোচনায় ফুটে ওঠে রক্তমাখা পদদলিত তাজা প্রাণের আত্মত্যাগের চিত্র।

৫২’র ‘একুশে ’ শব্দটি বাঙালিকে দিয়েছে আপন সভ্যতা আবিষ্কারের মহিমা। দমিয়ে রাখতে পারেনি কোন শক্তি! বরকত,জব্বার,রফিক,ছালাম,শফিউর,আউয়াল,ওহিউল্লাহ এবং এক অজ্ঞাত বালক নির্ভয়ে বুক পেতে দিয়েছে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রের মুখে।

লুটিয়ে পড়েছে রক্তাত্ব দেহ , চারিদিকে প্রতিবাদের সুরকে পারেনি থামাতে। শুধু একি বাক্য সবার মুখে শোভা পেতে লাগলো …. ‘‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’’ ।

১৯৫২ সালের এই দিনে ( ৮ফাল্গুন , ১৩৫৮ ) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন এ প্রেক্ষিতে দিনটিকে শহীদ দিবসও বলা হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারী বাংলার ইতিহাসে কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়, ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এ দিনটির রক্তাত্ব অধ্যায়ের সূচনা ঘটে, যার পরিণাম প্রাণের প্রিয় বাংলা ভাষা অর্জন।

১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিশে – পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা কি হবে? বাংলা না কি উর্দু? নামে বই প্রকাশের উৎস ধরে প্রতিবাদের মূল সুরের উত্থান ঘটে।

প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের বাংলা ভাষার প্রতি এতটায় উদাসীনতা ছিল যে সরকারী কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট , পোষ্টকার্ড , ট্রেনটিকেটে কেবলমাত্র উর্দু এবং ইংরেজীতে লেখা থাকতো।

পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী ভাবধারা আখ্যায়িত করে হীনতা প্রকাশ করতো।তমদ্দুন মজলিশের নেতৃত্বে ১৯৪৭ এর শেষের দিকে পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি উত্থাপিত হয়।

১৯৪৮ এর মাঝামাঝি সময়ে  ‘ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটির’  উদ্যোগে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে ‘‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’’। জিন্নাহর এমন ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্পষ্ট প্রতিবাদের ক্ষেত্র গড়ে ওঠে বাঙালি গোষ্ঠির মধ্যে।

জিন্নাহর গোড়ামিকে উপেক্ষা করে প্রতিবাদী ছাত্ররা আন্দোলনে আরো বেগমান হয়। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রাজপথের আন্দোলন সংগঠনের পাশাপাশি পার্লামেন্টেও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা রাখে।

১৯৫০ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান সরকারের অর্থনৈতিক বৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করলে প্রতিবাদের সুর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

১৯৫১ সালে গড়ে ওঠা পূর্ব পাকিস্তান ‘ইয়ুথ লীগ’ বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা এবং অধিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি পালনের উপর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাভাষার প্রতি জোড়ালো আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে।

১৯৫১ সালের শেষ ছয় মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জোড়ালো ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।

ঢাকা সফররত পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের সমাবেশে ঘোষণা করেন যে কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সমাবেশস্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।‘‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’’ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশ স্থল।১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে লুটিয়ে পড়েছিল আটটি তাজা প্রাণ, আহত হয়েছিল শতাধিক ছাত্র-জনতা।

দীর্ঘ ত্যাগ ও প্রতিক্ষার পর বাঙালি তার চেতনার অস্তিত্ব গুলো খুঁজে পেয়েছে বাংলা ভাষা অর্জনের মধ্য দিয়ে। তাই অমর একুশে হয়ে থাক বাঙালি জাতির সর্বকালের অহংকার। রচিত হোক ‘রক্তে আঁকা একুশের’ প্রতিচ্ছবি।

সিটিজিনিউজ / এসএ

Share.

Leave A Reply