চট্টগ্রামে মাশরুম চাষ উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ

0 107

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মরিয়ম আকতার : ১৯৮৮ সালের দিকে জাপানি কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ মাশরুম কাল্টিভেশন পাইলট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ১৯৯০ সাল পর্য্যন্ত বাস্তবায়িত প্রকল্পটির আওতায় মাশরুম স্পন উৎপাদনের জন্য ৭৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। ১৯৯৭–৯৮ সালের দিকে তৎকালীন সরকার মাশরুম চাষ উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়।

রাঙ্গামাটিতে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। সে সময় ভারত থেকে স্ট্র ও ওয়েস্টার মাশরুমের বীজ সংগ্রহ করে সেখানে সরবরাহ করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

১৯৯৮ সালে বিএআরসির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে চাষোপযোগী মাশরুমের জাতগুলোর ওপর গবেষণা কার্য্যক্রম হাতে নেয়া হয়। সে সময় অয়েস্টার, ইয়ার ও শিতাকে মাশরুমের চাষ পদ্ধতির প্রমিতকরণ ও জার্মপ্লাজম হিসেবে ২০টি জাত সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়। ২০০১–০৩ সাল পর্য্যন্ত কোনো প্রকল্প সহায়তা না থাকায় মাশরুমের উন্নয়ন কার্য্যক্রম কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। ২০০৩–০৬ সালের মধ্যে ‘মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহীত এ প্রকল্পের মাধ্যমে মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের পুরনো ল্যাবরেটরি ভবন সংস্কার ও সম্প্রসারণ, মাশরুম প্রশিক্ষণ হল তৈরি ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্য্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। সে সময় মাশরুমকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য এটি চাষের ওপর বিভিন্ন আঙ্গিকে আনুষ্ঠানিক–অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন এলাকায় সভা–সেমিনার আয়োজন করা হয়। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের কারণে জনসাধারণের মধ্যে মাশরুম চাষের আগ্রহ তৈরি হয়।
এছাড়া মাশরুম শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে মাশরুমের বীজ উৎপাদন কার্য্যক্রমকে আরো গতিশীল করে তোলা সম্ভব হয়। পরে ২০০৬–০৯ সালের মধ্যে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। মূলত এ সময়েই চাষাবাদ সম্প্রসারণসহ ব্যাপক আকারে মাশরুম শিল্পের উত্তরণ ঘটে। প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের মাশরুম গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্য্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাভারের সোবহানবাগে অবস্থিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাশরুম চাষ কেন্দ্রকে জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ছয়টি হর্টিকালচার সেন্টারে মাশরুম সাব–সেন্টার স্থাপন করা হয়। বর্তমানে গবেষণার দিক থেকে জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্রকে বেশ সফল বলা চলে। এখানে পরিচালিত গবেষণাগুলোয় পাওয়া ফলাফল নিবন্ধ আকারে বিভিন্ন দেশী–বিদেশী জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। এসব জার্নালে প্রকাশিত মোট গবেষণা নিবন্ধের সংখ্যা ১৯২। বর্তমানে মাশরুম উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে মোট ১৬টি সাব–সেন্টারের মাধ্যমে ব্যাপক ভিত্তিতে মাশরুম সম্প্রসারণ কার্য্যক্রম চালু রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য মাশরুম। এখানকার আবহাওয়া সারা বছরই মাশরুম উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এছাড়া এটি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ অনেক সস্তা ও সহজলভ্য। উৎপাদন কার্য্যক্রমে মূলধনও প্রয়োজন হয় খুবই সামান্য। এ আবহাওয়া কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করা যাবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে পুষ্টিচাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম। এছাড়া উৎপাদন পদ্ধতি অনেক সহজ হওয়ায় শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদেরও মাশরুম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এছাড়া দুই ফসলের মাঝামাঝি অলস সময় বা যে সময় মাঠে কম সময় দিতে হয়, সে রকম মুহূর্তেও ঘরে বসেই মাশরুম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন কৃষক। শুধু দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়; দেশের মানুষের পুষ্টিচাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাশরুম।

পুষ্টি উপযোগিতার দিক থেকে মাশরুমের বিশেষত্ব হলো, এতে শর্করা ও চর্বির পরিমাণ খুব কম এবং মানুষের দেহের প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ অনেক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে উন্নত মানের আমিষ রয়েছে ২৫–৩৫ শতাংশ। এছাড়া ভিটামিন ও খনিজ লবণ ১০–১৫ শতাংশ, শর্করা ও আঁশ ৪০–৫০ ও উপকারী চর্বি রয়েছে ৪–৫ শতাংশ। এছাড়া এটি ডায়াবেটিস, ব্লাড কোলেস্টেরল, মেদ–ভুঁড়ি, উচ্চরক্তচাপ, ভাইরাসজনিত রোগ, কিডনি রোগ, যৌন রোগ, এইডস, ব্রেস্ট ও অ্যানাল ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্যান্সার, জন্ডিস ও ডেঙ্গুজ্বরসহ বিভিন্ন জটিল রোগ প্রতিরোধ, নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কার্য্যকর বলে প্রমাণিত। এছাড়া দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মাশরুম অনন্য।
আমাদের কৃষিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন সম্ভব। জানা গেছে, দেশে ধান উৎপাদন করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ খড় পাওয়া যায়, তার মাত্র ১ শতাংশ কাজে লাগালেও প্রতি বছর অন্তত পাঁচ লাখ টন মাশরুম উৎপাদন সম্ভব, যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।

দেশে বর্তমানে মাশরুম উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় এক লাখ কৃষক। এর মধ্যে বড় পরিসরে উৎপাদন করছেন প্রায় ২০ হাজার। দেশে বর্তমানে মাশরুমের বার্ষিক গড় উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার টনে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন জনগণের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে রয়েছে মাশরুম। বাংলাদেশে অমিত সম্ভাবনা থাকলেও এখনো জনসাধারণের মধ্যে সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি মাশরুম। এ নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এখন খুবই জরুরি। বাংলাদেশে মাশরুম চাষের অন্তরায় ও সমস্যাগুলো নিয়ে কিছুদিন আগে এনইউ জার্নাল অব হিউম্যানিটিজ, সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড বিজনেস স্টাডিজে এক গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। ‘মাশরুম ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ: এ ক্রিটিক্যাল স্টাডি’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়, দেশে মাশরুমের চাহিদা বাড়লেও এ বৃদ্ধির গতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। এর পেছনে উৎপাদনকারী, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও ভোক্তাদের মধ্যকার যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবই দায়ী।

গবেষণায় আরো বলা হয়, নতুন উৎপাদনকারীরা শুরুতেই দু’টি ভুল করে বসেন। প্রথমত. মাশরুম উৎপাদন হলেও বাড়তি উৎপাদনশীলতার জন্য প্রতিটি আলাদা জাতের জন্য আলাদা ধরনের পরিচর্যা দরকার। সে বিষয়টিকে উপেক্ষা করে যান তারা। দ্বিতীয় ভুলটি হয় শুরুতে বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় পরিসরে শুরু করতে গিয়ে। কারণ প্রতিটি জাত সম্পর্কে আলাদাভাবে জ্ঞানার্জন বা অভিজ্ঞতা নেয়াটা তুলনামূলক সহজ ও নিরাপদ। কিন্তু সবগুলো সম্পর্কে একবারে জানা বা অভিজ্ঞতা গ্রহণ একই সঙ্গে বোকামি ও অসম্ভব।

এছাড়া মাশরুম উৎপাদনকারীদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কৃষকদের শুধু মাশরুমের লাভজনকতা, চাহিদা, অল্প মূলধন ও চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে প্রশিক্ষণ ও তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু এটি উৎপাদনসংশ্লিষ্ট ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ কোনো তথ্য পাচ্ছেন না উৎপাদনকারীরা।

অন্যদিকে মাশরুম ইনস্টিটিউটটের জন্য বরাদ্দও খুবই কম থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি সরকার, উৎপাদনকারী, কারখানা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বেসরকারি পর্য্যায়ের গবেষকদের মধ্যে যোগসূত্র খুবই দুর্বল। পাশাপাশি মাশরুম উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে ওঠেনি বলে বিপণন কৌশলের ক্ষেত্রেও খুব একটা উদ্ভাবনী সমাধান দেখাতে পারছেন না উৎপাদনকারীরা। উল্লিখিত সমস্যাগুলো দূর করা গেলেই মাশরুম উৎপাদনে আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে নিতে পারবে বাংলাদেশ। (শেষ)

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.