‘বক্স কালভার্ট উঠিয়ে পুনরায় খাল-নদী করতে হবে’

0

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন, স্থপতি ইকবাল হাবিব ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে যানজট নিরসনে খালের ওপর দোতলা সড়ক নির্মাণ করা হয় ষাটের দশকে। এর পরের ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সড়ক হওয়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ বেড়েছে। তীব্র হয়েছে যানজট, বেড়েছে শহরের তাপমাত্রা। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০৫ সালে সিউল দোতলা সড়ক উচ্ছেদ করে আবার খাল করে। প্রায় একই বাস্তবতা বিরাজ করা রাজধানী ঢাকাতেও সিউলের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের কয়েকজন পরিবেশবিদ।

১৪ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস’কে সামনে রেখে প্রিয়.কমের কাছে এই অভিমত দেন পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা এসব ব্যক্তি। তাদের মতে, ঢাকাসহ পুরো দেশকে পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বাঁচাতে এর বিকল্প নেই।

ঢাকার পরিবেশ দূষণ রোধে করণীয় জানতে চাইলে নদী নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকনের দাবি, ঢাকা শহরের আশপাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদী ছিল। এর বাইরেও ছিল আরও কয়েকটি। এর একটি ধোলাই। বর্তমানে সেটি পরিচিত ধোলাই খাল হিসেবে। এই খালের ওপর দিয়ে বক্স কালভার্ট দিয়ে রাস্তা করা হয়েছে। আরেকটি নরাই নদী, যার একটি অংশ হাতিরঝিল, আরেকটি ধানমণ্ডি লেক। নরাই নদীর ওপর কালভার্ট দিয়ে করা হয়েছে পান্থপথের রাস্তা।

রোকনের ভাষ্য, সোনাধান নামে আরও একটি নদী ছিল মিরপুরে। এটিও কংক্রিট, বক্স কালভার্ট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এই তিনটা নদী এখনো উদ্ধার করা সম্ভব। আর এটা সম্ভব হলে একদিকে যেমন যানজট কমবে, অন্যদিকে পরিবেশও বাঁচবে। নৌযান চলাচল শুরু হলে যে অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে, সেটার বেশি সুবিধাভোগী হবে রাজধানীর সাধারণ মানুষ বলে মনে করেন শেখ রোকন।

রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন। ছবি: প্রিয়.কম

‘ধোলাই খাল উদ্ধার করে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করা গেলে পুরান ঢাকায় যানজট থাকবে না। সোনাধান, ধোলাই (উদ্ধার) হলেও যানজট কমে যাবে একইভাবে’, বলেন রোকন।

ঢাকার খাল, নদ-নদী, জলাশয় উদ্ধার করে সেগুলোর সঙ্গে সারা দেশের নদ-নদীর সংযোগ সাধন করা অবশ্যই বাস্তবসম্মত চিন্তা বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার মতে, এটা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা প্রয়োজন।

‘বক্স-কালভার্ট উঠিয়ে পুনরায় খাল-নদী করতে হবে। আপনি (রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক) কোথায় গুরুত্ব দেবেন, সেটা আপনি জানেন। নদীর প্রতি গুরুত্ব দিলে নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশ বাঁচবে, এটা বলাই বাহুল্য’, বলেন ইকবাল হাবিব।

ঢাকায় এক সময় ৪৮টির বেশি খাল ছিল। ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে ২৬টি খাল রয়েছে। বাকি খাল দখল-ভরাট করে রাস্তা, ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। এই খালগুলো দখলমুক্ত করা আবশ্যক বলে মনে করেন ইকবাল হাবিব।

এই স্থপতি বলেন, ‘সরকার যদি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, এমআরটির (ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট) জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে পারে, তাহলে অবশ্যই খাল-নদীর জন্যও জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব এবং করা উচিত।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহানের মতে, বাংলাদেশে সবচেয়ে নিরাপদ ও কম দূষণ করে রেল, তারপর নৌপথ। কিন্তু সবচেয়ে দূষণ ও ব্যয়বহুল হলো সড়ক। তারপরও খাল-নদী ভরাট করে সড়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটা সম্ভব হচ্ছে দেশি ও আন্তর্জাতিক একটা চক্রের কারণে। সেই চক্রটি বাংলাদেশে সড়ক উন্নয়ন ও বেসরকারি পরিবহনের প্রসারে কাজ করছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান। ছবি: প্রিয়.কম

এই চক্রের বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, ‘সড়কের এই যানবাহন জাপান ও ভারত বিক্রি করে আমাদের দেশে। এডিবি ও বিশ্বব্যাংকে তারাই ছিল বেশি। এ জন্য নদীমুখিতার বদলে আমরা সড়কমুখী হয়েছি। নৌ ও রেল অবহেলিতই আছে।’

বর্তমান অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে বলেও উল্লেখ করেন ইকবাল। তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ পূর্বে ফিরে যেতে হবে। তখন নীতিমালা ছিল উত্তর-দক্ষিণে নদী বয়ে যাবে। পূর্ব-পশ্চিমে সড়ক করা যাবে না। পূর্ব-পশ্চিমে সড়ক করতে হলে সচেতনভাবে ব্রিজ করে করতে হবে। ১৯৭৫ সালের আগের সেই নীতিমালা থেকে আমরা সরে এসেছি। আমরা জালের মতো নদীকে হত্যা করে সড়কমুখী হয়েছি।’

প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘ঢাকার নদীগুলো উদ্ধার করে আশপাশের নদ-নদীর সঙ্গে সংযোগ করতে হবে। যদি আমরা এটা না করতে পারি, তাহলে ঢাকা শহর দীর্ঘদিন ধরে পানির নিচে থাকবে। দেশের অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তখন প্রকৃতি আমাদেরকে বাধ্য করবে খাল-নদীগুলো পুনরুদ্ধার করতে। এগুলো উদ্ধার করলেই চলবে না। পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের নদীগুলোও উদ্ধার করতে হবে, যাতে করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে। অর্থাৎ সারা দেশের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে পানি দক্ষিণাঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে মিশতে পারে।’

সিটিজিনিউজ/এইচএম 

Share.

Leave A Reply