বিচ্ছেদের অন্তরালে কী লুকানো?

217
  |  রবিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২০ |  ৮:২৯ অপরাহ্ণ


সিজিটি ডেস্কঃ  বিবাহ বিচ্ছেদ বর্তমান বাংলাদেশে এখন

ডাল-ভাত। ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনের হিসেব মতে, গত ছয় (২০১১-২০১৬) বছরে ৩৬ হাজার ৩৭১টি বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা হয়। স্ত্রীর পক্ষ থেকে ২৪ হাজার ৮০৩টি এবং স্বামীর পক্ষ থেকে ১২ হাজার ১৮টি। কার্যকর হয়েছে ৩০ হাজার ৮৫৫টি৷ ফলে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি বিচ্ছেদ ঘটছে শুধু রাজধানীতে। বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়া অধিকাংশের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

Advertisement

করোনা মহামারির মধ্যে মানুষের মধ্যে ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এতে লকডাউনের সময় বিচ্ছেদের হার কমে যায়। তবে লকডাউন শিথিল হওয়ার সাথে সাথে হু হু করে বাড়তে থাকে বিচ্ছেদের আবেদন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় জুলাই (২০২০) মাসে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে ৮৭৮টি। অন্যদিকে একই সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় তালাকের ঘটনা ঘটেছে ৬৫৪টি। অর্থাৎ দুই সিটি মিলিয়ে গত জুলাইতে ১ হাজার ৫৩২টি ডিভোর্স নথিভুক্ত হয়েছে। দুই সিটি মিলিয়ে ১ মাসের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ তালাকের ঘটনা। গড় হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫১টি ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে। এরা উচ্চ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য৷

দৈনিক প্রথম আলোতে (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০) প্রকাশিত এক নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ এবং ওসিডি ক্লিনিক কনসালট্যান্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন লেখেন, ‘মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, বিত্তবৈষম্য, কুসংস্কার, অজ্ঞানতা ও অশিক্ষার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। দম্পতির কেউ একজন পেশাগত কারণে দূরে অথবা প্রবাসে থাকলে নিজেদের অজান্তেই দূরত্ব বাড়ে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে এর জন্য দায়ী মনে করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বা তার পরিবারের চক্ষুশূল। অনেক বিবাহবিচ্ছেদে এই মানসিক সংকট ও টানাপোড়েন প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। তবে মানসিক রোগের কারণে কত যে ডিভোর্স হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। এর মধ্যে ওসিডি, বাইপোলার, পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি অন্যতম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমাজে প্রবল অসচেতনতা কাজ করে। মাদকাসক্তে যেখানে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করা প্রয়োজন, অদ্ভুত এক বিশ্বাসে উল্টো এসব রোগীকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়।’

বাংলাদেশ এখনো বাল্যবিয়ের ছোবল থেকে পুরোপুরি বের হতে না পারা একটি দেশ। তবুও যদি প্রত্যেকটি বিয়েকে গড়ে বাল্যবিয়ে নয় হিসাব করি তবে কি দেখা যায় ? সবাই ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে বিয়ে করছেন। সে হিসেবে ধরে নিচ্ছি সবাই গড়ে ২০ বছর বয়সে বিয়ে করেন। আর যখন বিচ্ছেদের হার ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মানুষের মধ্যে বেশি তখন বলাই চলে বিচ্ছেদ হওয়া সংসারগুলো অন্তত ১০ বছরের পুরেনো ! আর তাদের প্রত্যেকেরই একাধিক সন্তান রয়েছে। যারা সবাই শিশু । যেটি সমাজের জন্য চরম অশনি সংকেত বহন করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই বিচ্ছেদ? কোন সমস্যাটি বেশি প্রকট? প্রধানত এর জন্য ১. সঙ্গীর প্রতি সম্মান না থাকা, ২. পর্ন ও মাদকাসক্তি, ৩. সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন। এই ৩টি বিষয়কেই আমি বড় কারণ হিসেবে দেখি।

১. সঙ্গীর প্রতি সম্মান না থাকা:

একজন মানুষ যত খারাপই হোক না কেন সে ন্যূনতম সম্মান চায়। একজন ধর্ষক চায় না মানুষ তাকে ধর্ষক হিসেবে চিনুক। একজন ডাকাত চায় না তার সন্তান জানুক সে ডাকাত। সমাজে সবাই নিজেকে আলোকিত আর জ্ঞানী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। প্রচুর বাহবা আর সম্মান পেতে চায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে সে আত্মঘাতি বা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মানুষ কিছু সময় সঙ্গীর (স্বামী-স্ত্রী) কাছ থেকে সেই সম্মান টুকু পায় না। তখনই তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের চিন্তা আসে। একজন আরেকজনের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন বা আত্মহনন করে থাকে।

সঙ্গীকে আপনার পরিবারের (তার শ্বশুর বাড়িতে) কাছে তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করা। বন্ধুদের সামনে ছোট করা। গুরুত্ব না দেয়া। পার্টিতে গেলে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে না দেয়া। কথায় কথায় গালাগাল দেয়া। তুচ্ছভাবে দেখা, তাকে নিজের চেয়ে অনেক কম যোগ্যতা সম্পন্ন মনে করা। এমন ঘটনা অসম্মান বোধ থেকে ঘটে। যেটিতে দুজনেরই সামাজিক ক্ষতি সাধিত হয়। আর এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না কখনোই অপর সঙ্গী। তাই তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের চিন্তা দিন দিন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এমন চিন্তা থেকে একে অন্যকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। এমনও হয় নিজের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি মনে করে অনেকে। তবে যারা ন:পুংশক বা বন্ধা তাদের কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে।

আরও একটি সমস্যা হচ্ছে, পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পুরুষের তুলনায় নারীরা জ্ঞান-বুদ্ধিতে প্রকৃতিগতভাবে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে। এসব ধারণা থেকেও বাড়ছে নারীর প্রতি অসম্মান আর অশ্রদ্ধার মত আচরণের। অথচ যে সকল আঞ্চলে নারীরা পুরুষের সমান সুযোগ সুবিধা পেয়েছে সেসব অঞ্চলে তারা ক্ষেত্র বিশেষে পুরুষের তুলনায় ভালো করছে।

২.পর্ন ও মাদকাসক্তি:

ডয়েচে ভেলে’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের মের্সেবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাইনৎস-য়্যুর্গেন ফস মনে করেন, পর্নগুলো পুরুষতান্ত্রিক৷ তাই এগুলো ছেলেমেয়েদের মানসিকতায় সেভাবেই প্রভাব ফেলে। আর গবেষণায় দেখা যায় ৮০ ভাগ ছেলে ও ৪০ ভাগ মেয়ে অনলাইনে পর্ন দেখে। সান দিয়েগোর নাভাল মেডিকেল সেন্টারের ইউরোলজিস্ট ম্যাথিউ ক্রিস্টমানের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন পুরুষ শারীরিক সংসর্গের সময় যতটা উত্তেজিত থাকেন, পর্ন দেখার সময় তার চেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। আর যৌনতা শুধু শারীরিক ব্যাপার নয়, এটা মানসিক ব্যাপারও বটে। তাই সঙ্গীর সাথে তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। একাধিক সঙ্গী খোঁজেন তারা।

একটা ছেলে যখন নগ্ন কোন ছবি দেখে তখন তার ব্রেনের ভেতরে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কিছু রাসায়নিক পদার্থের (টেস্টোস্টেরন তৈরির সিগনাল, নিউরোট্রান্সমিটার যেমন, ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন) ধারাবাহিক ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। পর্নগ্রাফিক ছবির প্রতি ব্রেনের এই রেসপন্স যখন শুরু হয়, ব্রেন তখন একে ‘সেক্সুয়াল কিউ’ হিসেবে ধরে নেয়া যায় কিনা একটা স্মৃতি হিসেবে ব্রেনের ভেতরেই রয়ে যায়! এই আসক্তি এতটাই ভয়ংকর যে এতে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়। তখন সঙ্গীর কাছে নিজেকে তাচ্ছিল্যের পাত্র বলে মনে হয়। সঙ্গী তাকে খুব ছোট করে দেখছে এমন মনে হয়। তখনই সন্দেহ হয় তার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই তো? আর সঙ্গীর প্রতি রাগ বাড়তে থাকে অকারণে। কিন্তু বাস্তবতা দেখা যায় ভিন্ন।

অন্যদিকে মাদকাশক্তরা ড্রাংক অবস্থায় সঙ্গীর সাথে উদ্ভট অমানবিক ও পশুর মতো আচরণ করে থাকেন। যা পরবর্তীতেও অনেকে ভুলতে পারেন না। এটি ভালোবাসাহীনতা তৈরী করে। দায়িত্ব বোধ পালনে অনীহা দেখা দেয়। অন্যদিকে এসব মানুষের সঙ্গীর প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে। আবার তারা পর্ন সিনেমার নায়িকাদের মতো আকর্ষণীয় দেহ ও চেহারার নারী খোঁজে বাস্তব জীবনে। কিন্তু পর্ন সিনেমার নায়িকাদের সৌন্দর্য মূলত কৃত্রিম সৌন্দর্য, তাদের আচরণও কৃত্রিম। মেকআপ, লাইট ও ক্যামেরার কারসাজিতে তাদেরকে মোহনীয়ভাবে দেখানো হয় যা বাস্তব জীবনে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।

এতে মানুষের রুচিবোধের অধঃপতন হয়। পর্ন সিনেমার অনৈতিক ও যৌনতা নির্ভর বিকৃত সম্পর্ক গুলোকেই তখন ভালো লাগতে শুরু করে। স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোতেও নিজের অজান্তে বিকৃতি খোঁজে তাদের চোখ। অনেকে আবার স্ত্রীকে নিয়ে গ্রুফ সেক্সে অংশ নেয়ার মতো ভয়ানক আনুরোধ করেন সঙ্গীকে। কারণ তারা বার বার সঙ্গী পরিবর্তন করে পর্ন সিনেমার মতো কাউকে না পাওয়ায়। আসলে এরা কোনো নারীতেই তুষ্ট থাকতে পারে না। হিতাহীত বোধ হারিয়ে ফেলে।

পর্ন বিবাহিত জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, যৌনস্পৃহার পরিবর্তন ঘটায়। বিকৃত যৌনচর্চার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নিজেকে সামাজিক কাজগুলো থেকে গুটিয়ে রাখে, কখনো হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। অকারণে অন্যের ওপর খবরদারি করার প্রবণতা তৈরী হয়। আচরণের পরিবর্তন দেখা যায়, হঠাৎ করে রেগে ওঠে, মেজাজ খিটখিটে থাকে, বিষণ্নতা দেখা দেয়। পর্নর প্রভাবে নানা সামাজিক বা যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। মার্কিন গবেষক ড. জুডিথ রিসম্যান পর্নোকে ‘ইরোটোটক্সিন’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘পর্নচর্চা করতে থাকলে মস্তিষ্কে ডোপামিন, এপিনেফ্রিন, এন্ডোরফিন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থের সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়, মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, চিন্তা ও আচরণের সমস্যা দেখা দেয়।’ আসক্ত ব্যক্তি জড়িয়ে যেতে পারে সাইবার অপরাধে বা নিজেও সাইবার অপরাধের শিকার হতে পারে।

এতে করে অনেক পুরুষ তার স্ত্রীকে সেক্সের সময় হাত দিয়ে মারেন। চড়-থাপ্পড় দেন। মা বাপ তুলে গালি দেন। এটা নারীকে চরম অসহায় আর একা করে তোলে। এটিও বিচ্ছেদের একটি কারণ হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে তুরস্কে এক নারী তার স্বামীর প্রতি এমন অভিযোগ এনে অবসান ঘটান ৩৫ বছরের সংসার জীবনের। তার অভিযোগ হঠাৎ তার পুরুষ পর্ন আসক্ত হয়ে আচরণ বদলে গেছে।

৩. সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন:

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, মানুষ তার জীবনে ভালোবাসার মানুষটির দ্বারাই এখন অহরহ এই অবজেক্টিফিকেশনের শিকার হচ্ছে! বর্তমান বাংলাদেশে এর শিকার হন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, সেলিব্রেটি সব সমাজেই এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। যার রেজাল্ট ১০-১১ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি টানছেন অনেক নারী।

সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন মানেই মানুষকে শারীরিক বস্তুর পর্যায়ে ভাবা ও প্রকাশ করা এবং মানবসত্ত্বার অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলা। অবজেক্টিফিকেশন একজন মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা ও কর্মশক্তিতে বাধা দেয়। শুধু তাই নয়, এই অবজেক্টিফিকেশন মানসিক হতাশা ও নিজের শরীর নিয়ে সব সময় লজ্জা পায়। তখন সে অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত থাকে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনযাপনে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। ‘জার্নাল অব সেক্স রিসার্চ’এর ২০১১ সালের ইস্যুতে প্রকাশিত পিটারসেনের এক গবেষণায় বলা হয়, শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে পুরুষ এবং নারীদের চিন্তা ও ব্যবহারে ভিন্নতা দেখা যায়। দৈহিক অন্যান্য চাহিদার মতোই শারীরিক চাহিদার কথা নারীদের চেয়ে পুরুষরা দিনে প্রায় দ্বিগুণ বেশি চিন্তা করে। আর এই চিন্তায় প্রভাব রাখে এখনকার সহজলভ্য-সস্তা পর্নগ্রাফি, নগ্ন ছবি, ফেইসবুকের ১৮+ পেইজ ইত্যাদি।

যেভাবেই হোক না কেন তারা তাদের সঙ্গীকে ‘সেক্স অবজেক্ট’ হিসেবে ধরে নিয়ে আচরণ করেছে। তা না হলে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে সঙ্গীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাও তাদের কাছে প্রাধান্য পাবার কথা। শুধু তাই না, দেখে দেখে শিখে নেয়ার জন্যে দায়ী মাথার সামনের দিকের (ফ্রন্টাল এবং প্যারাইটাল লোব) নিউরনগুলো, পর্ন দেখানো কাজগুলোকে আয়নার প্রতিচ্ছবির মতো ধরে রাখে, যার কারণে ছেলেরা তাদের সঙ্গীর সাথে পরবর্তীতে হুবহু ওই কাজগুলোই করতে চায়! অর্থাৎ সস্তা এসব পর্নগ্রাফি জীবনসঙ্গীর সাথে ভালোবাসার বন্ধনের শক্ত জায়গাগুলোকে রীতিমতো ছিনতাই করে তাদেরকে সেক্স অবজেক্ট হিসেবে ধরে নিতে এবং সেক্স অবজেক্ট হিসেবেই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত করে তোলে!

২০০৯ সালে পরিবার ও সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞানীদের গবেষণা, আর্টিকেল, সংবাদ এবং সাক্ষাৎকার ওঠে আসে ‘ফ্যামিলিজ অ্যাজ দে রিয়েলি আর বইতে। এই বইতে প্রকাশিত প্রায় তের হাজার মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, যে কোন সঙ্গীর সাথে প্রথমবার শারীরিক সম্পর্কে গিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষ দৈহিক চাহিদা পূরণের পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করে, অন্যদিকে অপরিচিতের সাথে প্রথমবারেই সন্তুষ্টি লাভ করে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নারী। কিন্তু দীর্ঘদিনের ভালোবাসার মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সন্তুষ্টি লাভের এই হার নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যে প্রায় কাছাকাছি! অর্থাৎ সঙ্গীকে কেবলমাত্র সেক্স অবজেক্ট হিসেবে নিয়ে দৈহিক চাহিদা মেটানো ছেলেদের জন্যে তুলনামূলকভাবে সহজ, অন্যদিকে নারীর দৈহিক চাহিদার পরিপূর্ণতা সঙ্গীর বিশ্বস্ততার ওপর নির্ভরশীল।

বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে নারীদেহের নগ্নতা যেহেতু এখন অনেকটাই সহজলভ্য, তাই মোবাইলের স্ক্রিনে কিংবা কম্পিউটারে একজন পুরুষ চাইলেই ২ মিনিটের ভেতর শতেক সুন্দরীদের ছবি দেখে নিতে পারে। একশ ছবির ভেতর একটা ছবি দেখে যতক্ষণে তার মনে হয়, এটাই বেস্ট আর এটাই শেষ, ততক্ষণে দেখা যায়, আরো ৩০ সেকেন্ড চলে গেছে এবং ঐ বেস্ট ছবি ফেলে আরো কয়েকটা হট ছবি তার দেখা হয়ে গেছে! ভালো লাগার পরেও একটা ছবি ফেলে আরো কয়েকটায় ঘুরে আসার এই ব্যাপারটা মানুষের ভেতরে পরোক্ষভাবে যে ধারণার জন্ম দেয়, তা হলো, মানুষ আসলে ডিসপোজেবল, অর্থাৎ, একবার ব্যবহার করার পর ফেলে দেয়ার বস্তু! সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশনের ট্রিগার ছেলেদের মাঝে সঙ্গীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে এক ধরনের ছবি তৈরি করে দেয়। আইডল ধরে নেয়া এই ছবির সাথে তার সঙ্গীর ছবি না মিললে সে তখন তার ব্রেনে সেট হয়ে বসে থাকা আইডল ছবি থেকে ‘সেক্সুয়াল কিউ’ নিয়ে তারপর শারিরিক সম্পর্ক স্থাপন করে! অর্থাৎ যে ভালোবাসা নৈতিকভাবে তার সঙ্গীর প্রাপ্য, সেই ভালোবাসা সে বিকিয়ে দিচ্ছে মাথার ভেতরের নগ্ন কিছু প্রতিচ্ছবির কাছে!

এটা সত্যি যে প্রাকৃতিকভাবে ছেলেরা মেয়ের প্রতি মেয়েরা ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করবে। কিন্তু তার অর্থ এই না যে, প্রকৃতি থেকে ছেলেদের মাথায় মেয়েদেরকে কেবল ‘সেক্স অবজেক্ট’ হিসেবে ভাবতে শেখানোর প্রোগ্রাম সেট করে দেয়া আছে। একটা ছেলের চারপাশের মানুষ, পরিবেশ, সংস্কৃতি বড় একটা প্রভাব রাখে, সে তার সঙ্গীকে কীভাবে এবং কতটা মূল্যায়ন করছে তার উপর। ‘আত্ম’ সম্পর্কে হীনমণ্যতায় ভুগতে থাকা ছেলেদের মাঝে খুব সহজেই প্রকৃতি প্রদত্ত প্রবৃত্তিকে উশকে দেওয়া যায়। মার্কেটিং এর এই যুগে কোম্পানিগুলো এখন ঠিক এই কাজটাই করে। ২০১২ সালে হাফিংটন পোস্টে আসা একটা রিপোর্টে বলা হয়, আজকাল ব্রেনের সামনে ছেলেদেরকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আর মেয়েদেরকে যন্ত্রের মতো পার্ট বাই পার্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে করে ব্রেন সাধারণ ঘরোয়া মেয়েদেরকেও ‘সেক্সুয়াল পার্ট’ হিসেবে দেখতে শুরু করে!

যথেষ্ট শিক্ষিত,পারিবারিক, সামাজিক এবং আর্থিক অবস্থানও বেশ শক্ত, তাদের সঙ্গীরাও প্রত্যেকেই ভদ্র-মার্জিত সমাজের প্রতিনিধি, তাহলে কেন তারা সঙ্গীদের কাছে ‘ভালোবাসা’ দাবি না করে ‘শরীরটাকে’ দাবি করছে। এটি নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ আর হীতাহীত জ্ঞান না থাকার জন্য। তা না হলে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে সঙ্গীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাও তাদের কাছে প্রাধান্য পাবার কথা। আমরা বারবার ভুলে যাই যে, ‘ভালোবাসা’ অনুভূতিটায় সবসময় উত্তেজনা পূরণ করাটাই মুখ্য ব্যাপার নয়। আর তাই শুধুমাত্র এই অংশটাকে পূরণ করার জন্যে সঙ্গীর মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে অসম্মান করার মত অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশই আমাদের আশেপাশে এ ধরনের ঘটনাগুলোর জন্ম দিয়েছে, দিচ্ছে এবং এই অবস্থা চলতে থাকলে এমন অসুস্থ মানসিকতা ভবিষ্যতেও আরো অনেক দুঃখজনক ঘটনার জন্ম দেবে।

বর্তমান শিক্ষিত সমাজের সব পুরুষ অবশ্যই এক নয়, নেহায়েৎ কম কিছু নয়। তারা কি একবারও ভাবে, শরীর জিনিসটা শুধু ‘নেয়ার’ব্যাপার নয়, ‘দেয়ার’ও ব্যাপার বটে? তারা কি জানে যে, কাকে নিজেদের শরীরটা তারা দিচ্ছে? কৃত্রিমভাবে তৈরি কোন রগরগে নারীদেহকে নাকি প্রাকৃতিভাবে শিল্পায়িত তার জীবনসঙ্গী ও ভালোবাসার মানুষটিকে, তার সন্তানের মাকে। পর্ণ আসক্ত, সেক্সুয়াল অবকেক্ট হিসেবে সঙ্গীকে ব্যবহার করা মানুষগুলো দেখা যায় সঙ্গমের সময় সঙ্গিকে আঘাত করেন। চড়-থাপ্পড় দেন। বিকৃত ভাব মিলতে চান। যেটি কখনোই আদর্শ দাম্পত্যের ম্যধে পেড়ে না। এই ঘটনাগুলো যখন প্রাথমিক দিকে থাকে তখন অনেকেই মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিচ্ছেদ একটি নারীকে সমাজে ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করে তাই তারা শত কস্ট সয্যকরে সংসার টিকিয়ে রাখতে চান। কিন্ত এই সমস্যাগুলোর কাছে অনেকেই হার মানেন যখন ৮-১০ বছর যাবত এটি চলতে থাকে।

আপনার মঝে এমন সমস্যা থাকলে নিজের ভুল স্বীকার করে নিন। নিজেকে সামলে নিন। সঙ্গী এমন হলে তার সাথে আলোচনায় বসুন বার বার। ধৈর্য ধরুন। সময় নিন, সময় দিন। ফিরে আসুন আবার আগের মত করে দুজন দুজনের কাছে। ফিরে আসার পর আরো মধুর হবে সম্পর্ক।

বি:দ্র: বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণা পত্রের রিভিও। গবেষণা পত্র। মনোবিজ্ঞানিদের বিভিন্ন বইয়ের সাহয্য নেয়া হয়েছে লেখার ক্ষেত্রে।

লেখক: সাংবাদিক, স্বাধীন গবেষক।

সূত্রঃ সময় টিভি

আরসি

Advertisement