করোনার ভ্যাকসিন নিলে ‘বন্ধ্যাত্ব’, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?

31
 স্বাস্থ্য ডেস্ক : |  রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ |  ৪:৫১ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে ফাইজারের কোভিড-১৯ টিকা ‍নারীদের বন্ধ্যা করে দেয় বা গর্ভবতী নারীদের গর্ভফুলের ওপর আক্রমণ করে। তবে এটাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলছেন বিজ্ঞানীরা।

লন্ডনের কিংস কলেজের স্ত্রীরোগ বিষয়ে অধ্যাপক এবং রয়াল কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনোকোলজিস্টের মুখপাত্র লুসি চ্যাপেল বলেছেন ‘এমন কোন জৈব প্রক্রিয়া’ নেই যার মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন নারীর গর্ভধারণ ক্ষমতাকে নষ্ট করতে পারে।

Advertisement

ভ্যাকসিন যেভাবে কাজ করে: করোনাভাইরাসের বিশেষত্ব যে ‘স্পাইক প্রোটিন’ তার একটি কণা যা ক্ষতিকর নয়, সেটি তৈরি করে এই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে শরীর এই স্পাইককে চিনতে শেখে। টিকার মাধ্যমে ঢোকা নতুন এই স্পাইককে ঠেকাতে তৎপর হয়ে ওঠে শরীরের রোগ প্রতিরোধী প্রক্রিয়া। শরীরে তৈরি হয় অ্যান্টিবডি এবং ভাইরাস ঠেকাতে তৈরি হয় রক্তের শ্বেতকণিকা। বিশেষ এই স্পাইকযুক্ত ভাইরাস ভবিষ্যতে আবার আক্রমণ করলে এভাবে তার সাথে লড়ার ক্ষমতা শরীরে তৈরি হয়ে থাকে। এই ভ্যাকসিন আপনার শরীরে ভাইরাস ঢোকাচ্ছে না এবং আপনার নিজস্ব জিন সম্পর্কিত কোনো তথ্যকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা এই ভ্যাকসিনের নেই।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নিকোলা স্টোনহাউসও বলেছেন, নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর এই টিকার কোনোভাবেই প্রভাব ফেলার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তার কাছে নেই।

অনলাইনে কিছু মানুষ যুক্তরাজ্য সরকারের আগে প্রকাশিত একটি দিকনির্দেশনা থেকে একটি লাইন তুলে ধরেছে যেখানে সেসময় বলা হয়েছিল ফাইজারের টিকা প্রজনন ক্ষমতার ওপর কোন প্রভাব ফেলে কিনা তা ‘অজানা’। তবে এই নির্দেশিকা পরে আপডেট করা হয়েছিল যেখানে ব্যাখ্যা করা হয় যে, প্রাণীদেহে চালানো পরীক্ষায় প্রজনন ক্ষমতার ওপর এই ভ্যাকসিনের কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক চ্যাপেল বলছেনন, ফ্লু ভ্যাকসিনসহ নিষ্ক্রিয় জীবাণু দিয়ে তৈরি অন্যান্য ভ্যাক্সিন থেকে দেখা গেছে এধরনের টিকা প্রজনন ক্ষমতার ওপর কোন প্রভাব ফেলে না এবং এমনকি অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্যও এধরনের টিকা নিরাপদ।

আর অধ্যাপক স্টোনহাউস বলছেন, কোভিড ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সেটা কিন্তু বন্ধ্যাত্ব ঘটাতে পারে। সেখানে এই টিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিচ্ছে। ভ্যাকসিন নেবার পর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয় না, বরং কোভিড আক্রান্ত হবার পর আপনার গর্ভধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবার আশংকাই বেশি।’

সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কিছু গুজবে এমন দাবিও করা হয়েছে যে এই ভ্যাকসিনের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করার পেছনে কারণ হল যে প্রোটিনের বার্তা দিয়ে এই টিকা তৈরি করা হয়েছে, সেই একই প্রোটিন থাকে প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুলে। কাজেই তাদের দাবি হল এই ভ্যাকসিন নিলে শরীর প্ল্যাসেন্টাকেও আক্রমণ করার জন্য তৈরি হবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই টিকা যে প্রোটিন দিয়ে তৈরি তার সাথে প্ল্যাসেন্টা যে প্রোটিন থেকে তৈরি হয় তার সাথে কিছুটা মিল রয়েছে বটে, কিন্তু এই দুই প্রোটিনের চরিত্র হুবহু এক নয়, তাদের মধ্যে যে তফাতগুলো আছে তা কখনই আমাদের শরীরের প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করবে না।

অধ্যাপক চ্যাপেল বলছেন, প্রোটিনের এই মিলের মধ্যে “উদ্বিগ্ন হবার কিছুই নেই”, কারণ প্রকৃতিতে এই একই জাতের প্রোটিন আরও অনেক কিছুর মধ্যে আছে। মোট কথা হলো, একটি জিনের দৈর্ঘ্য, তার গঠন ও পরম্পরা সব কিছু মিলে একটা জিন তার নিজস্বতা অর্জন করে। দুটো জিন কখনও হুবহু একই বৈশিষ্টের হয় না।’

গর্ভবতী নারী ও যারা গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন তাদের নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন অধ্যাপক চ্যাপেল। তিনি বলেছেন কোভিডের ভ্যাকসিনের সাথে প্রজনন ক্ষমতার যোগাযোগ নিয়ে তিনি একেবারেই উদ্বিগ্ন নন।

ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার, জোনাথান ভ্যান ট্যামও বলেছেন, ‘কোন টিকা নিয়ে করোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করেছে এমন কথা আমি কখনও শুনিনি। ভীতি ছড়ানোর জন্যই এ ধরনের জঘন্য দাবি তোলা হচ্ছে।’

Advertisement