জন্মদাগ কী, কেন হয়?

59
 স্বাস্থ্য ডেস্ক : |  বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১ |  ৩:০৩ অপরাহ্ণ

জন্মদাগ হলো জন্ম বা জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহ থেকে ত্বকে দৃশ্যমান এক ধরনের বিবর্ণতা। মুখমণ্ডল বা শরীরের যেকোনো স্থানে জন্মদাগ থাকতে পারে। রঙ, আকার-আকৃতি ও উপস্থিতিতে জন্মদাগের বৈচিত্র্যতা রয়েছে।

কিছু জন্মদাগ স্থায়ী এবং সময় পরিক্রমায় বড় হতে থাকে। অন্যান্য জন্মদাগ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিলিয়ে যায়। অধিকাংশ জন্মদাগই নিরীহ প্রকৃতির, তবে কোনো কোনো জন্মদাগ শরীরের ভেতরে রোগের নির্দেশক হতে পারে। শরীরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে কিছু জন্মদাগকে অপসারণ করা যেতে পারে।

Advertisement

কেন জন্মদাগ হয়? এ প্রসঙ্গে একটি মিথ বা ভুল ধারণা হলো- গর্ভবতী নারী যথেষ্ট পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খায় না তথা গর্ভস্থ শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। এটাকে সত্য বলার জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভবতী নারী গর্ভাবস্থায় কি করেন অথবা করেন না তাকে কেন্দ্র করে বাচ্চার শরীরে জন্মদাগ সৃষ্টি হয় না। প্রকৃতপক্ষে, জন্মদাগের আবির্ভাবের রহস্য এখনো অজানাই রয়ে গেছে।

জন্মদাগ কি বংশগত? কিছু জন্মদাগের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশই বংশগত নয়।
পরবর্তীকালে জন্মদাগ হতে পারে? কেবল সেই দাগকে জন্মদাগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা জন্ম থেকেই বিদ্যমান আছে অথবা জন্মগ্রহণের কিছু পরেই বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে একজন মানুষের শরীরে তিলের মতো দাগের উদয় হতে পারে, কিন্তু তখন আর এটাকে জন্মদাগ বিবেচনা করা হবে না।

জন্মদাগের ধরন:
অধিকাংশ জন্মদাগই দুইটি ক্যাটাগরির একটিতে পড়ে। উভয় ক্যাটাগরির পৃথক কারণ রয়েছে। এই দুইটি ক্যাটাগরি হলো: ভাস্কুলার জন্মদাগ এবং পিগমেন্টেড জন্মদাগ। ত্বকের কোনো স্থানের রক্তনালীগুলো যেমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত তেমনভাবে না হলে ভাস্কুলার জন্মদাগ হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি স্থানে অনেক রক্তনালী গুচ্ছাকারে থাকে অথবা রক্তনালীগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রশস্ত হতে পারে। অন্যদিকে শরীরের একটি স্থানে প্রচুর পিগমেন্ট সেল বা রঞ্জক কোষ থাকলে পিগমেন্টেড জন্মদাগ হয়। পিগমেন্ট সেল বা রঞ্জক কোষই ত্বককে প্রাকৃতিক/স্বাভাবিক রঙ দেয়। কিন্তু খুব বেশি হয়ে গেলে স্বাভাবিকতা আর বজায় থাকে না।

পিগমেন্টেড জন্মদাগের ধরন
ত্বকের একটি অংশে অন্যান্য অংশের তুলনায় রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি বেশি হলে পিগমেন্টেড বার্থমার্ক হয়ে থাকে। এই জন্মদাগের কিছু ধরন রয়েছে: মোলস (কনজেনিটাল নেভি), ক্যাফে অউ লেইত স্পটস ও মনগোলিয়ান ব্লু স্পটস।

মোলস/কনজেনিটাল নেভি বা জন্মগত তিলের রঙ পিংক, হালকা বাদামী অথবা কালো হতে পারে। এগুলো বিভিন্ন আকৃতি এবং সমতল বা উঁচু প্রকৃতির হতে পারে। সাধারণত আকৃতিতে জন্মগত তিল গোলাকার হয়ে থাকে। মুখমণ্ডল বা শরীরের যেকোনো জায়গায় তিল ওঠতে পারে। কিছু তিল সময়ের আবর্তনে দূর হয়ে যায়, কিন্তু অন্যগুলো আজীবন থেকে যায়। কখনো কখনো তিলে কোনো ধরনের পরিবর্তন স্কিন ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।

ক্যাফে অউ লেইত স্পটস হলো ফ্রেঞ্চের ভাষা। এটাকে বাংলায় করলে অর্থ দাঁড়ায়- দুধের সঙ্গে কফি। এই জন্মদাগ কিছুটা ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। এগুলো প্রায়শ ফ্যাকাশে বাদামী রঙের হয়ে থাকে। জন্ম থেকে প্রাথমিক শৈশবের যেকোনো সময় এই জন্মদাগ আবির্ভূত হতে পারে। এগুলো বড় আকারের হলেও প্রায়ক্ষেত্রে একসময় মিলিয়ে যায়। কিছু শিশুর একের অধিক ক্যাফে অউ লেইত স্পট থাকতে পারে। এই দাগটি কোনো শিশুর ত্বকে কয়েকটি থাকলে তার নিউরোফাইব্রোম্যাটোসিস নামক একটি বিরল রোগও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

মনগোলিয়ান ব্লু স্পট হলো সমতলাকৃতির নীলাভ ধূসর জন্মদাগ। এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডার্ক স্কিন বা কালো ত্বকের বাচ্চাদের শরীরে দেখা যায়। এগুলো মারাত্মক কিছু নয়। এই দাগকে কালশিটে মনে করে ভুল হতে পারে। সাধারণত নিচের পিঠ ও নিতম্বে মনগোলিয়ান ব্লু স্পটের আবির্ভাব ঘটে। শিশুর বয়স চার বছরের মধ্যে দাগটি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়।

ভাস্কুলার জন্মদাগের ধরন
কখনো কখনো কিছু অতিরিক্ত রক্তনালী একসঙ্গে দলা পাকিয়ে যায়, যা ত্বকে দৃশ্যমান হতে পারে। এটাকে ভাস্কুলার জন্মদাগ বলা হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ নবজাতকের শরীরে জন্মদাগটি থাকে। ভাস্কুলার জন্মদাগের ধরন হলো: স্যালমন প্যাচেস, হেমানগিওমাস ও পোর্ট-ওয়াইন স্টেইন (নিভাস ফ্লামিয়াস)।

স্যালমন প্যাচেস নামক লাল বা পিংক রঙের জন্মদাগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে, চোখের পাতা ও ঘাড়ে লক্ষ্য করা গেছে। এটাকে কখনো কখনো এনজেল কিসেস বা স্টর্ক বাইটস হিসেবে রেফার করা হয়। ত্বকের নিচে ছোট ছোট রক্তনালী গুচ্ছবদ্ধ হয়ে স্যালমন প্যাচেস হয়। কখনো কখনো জন্মদাগটির রঙ ফ্যাকাশে হতে পারে এবং মেডিক্যালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।

হেমানগিওমাস নামক জন্মদাগের রঙ পিংক, নীল অথবা উজ্জ্বল লাল হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রান্তীয় অঙ্গ, মাথা অথবা ঘাড়ে দাগটির আবির্ভাব ঘটে। ছোটাকার ও সমতলাকৃতি নিয়ে হেমানগিওমাসের যাত্রা শুরু হলেও একসময় তা বাড়তে বাড়তে অস্বাভাবিক উঁচু ও বড় হতে পারে। শিশুরা কৈশোরে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক হেমানগিওমাস দূর হয়ে যায়। কিছু দ্রুত বর্ধনশীল হেমানগিওমাসকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অপসারণ করতে হয়, অন্যথায় দৃষ্টি বা শ্বাসক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। শিশুর ত্বকে একাধিক হেমানগিওমাস দেখলে শরীরের অভ্যন্তরেও রয়েছে কিনা পরীক্ষা করা উচিত।

ত্বকের নিচে ছোট ছোট রক্তনালীর গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে পোর্ট-ওয়াইন স্টেইনস বা নিভাস ফ্লামিয়াস নামক জন্মদাগ হয়ে থাকে। শরীরের যেকোনো স্থানে দাগটির আবির্ভাব ঘটতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে মুখমণ্ডল ও ঘাড়ে। পোর্ট-ওয়াইন স্টেইনের রঙ প্রথমে পিংক বা লাল দেখালেও পরবর্তীতে পার্পল বা কালচে লাল হতে পারে। এগুলো সময়ের আবর্তনে মিলিয়ে যায় না এবং চিকিৎসা না করলে আরো কালচে হতে পারে। ত্বকও খুবই কালচে, পুরু অথবা নুড়িময় হতে পারে। চোখের পাতায় পোর্ট-ওয়াইন স্টেইন হলে মেডিক্যালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। বিরলক্ষেত্রে এধরনের জন্মদাগের সঙ্গে জেনেটিক কন্ডিশনের সম্পর্ক থাকে।

জন্মদাগের চিকিৎসা
অধিকাংশ জন্মদাগই নির্দোষ প্রকৃতির এবং চিকিৎসা বা অপসারণের প্রয়োজন হয় না। কিছু জন্মদাগের উপস্থিতির ভিত্তিতে সৌন্দর্যে অস্বস্তি বোধ হতে পারে। কোনো কোনো জন্মদাগ মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন- হেমানগিওমাস বা মোলস থাকলে স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এরকম দাগকে ত্বক বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপসারণেরও প্রয়োজন পড়তে পারে। জন্মদাগ অপসারণের পদ্ধতি হলো: লেজার থেরাপি, বিটা-ব্লকার্স, করটিকোস্টেরয়েডস ও সার্জারি।

লেজার থেরাপি দিয়ে পোর্ট-ওয়াইন স্টেইন দূর করা যায়। এই দাগের চিকিৎসা শুরুর দিকে করলে সফলতার সম্ভাবনা বেশি। লেজার থেরাপি জনিত অস্বস্তি কমাতে চিকিৎসকে লোকাল অ্যানেস্থেটিক দিতে পারেন। এই চিকিৎসার অন্যতম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো সাময়িক ফোলা বা কালশিটে। লেজার থেরাপি ব্যবহারে স্থায়ীভাবে জন্মদাগ দূর করা যায়।

উচ্চ রক্তচাপে ব্যবহৃত মুখে সেবনযোগ্য ওষুধ বিটা-ব্লকার্স হেমানগিওমাসের আকার-আকৃতি বা উপস্থিতি কমাতে পারে। এটা রক্তনালীকে সংকুচিত করে রক্ত চলাচল কমায়। এর ফলে হেমানগিওমাস নরম, সংকুচিত বা ছোট হয়ে যায়। প্রদাহ প্রশমক ওষুধ করটিকোস্টেরয়েডসও জন্মদাগকে ছোট করতে পারে। এটা মুখে সেবন করা যায় অথবা জন্মদাগে সরাসরি ইনজেক্ট করা সম্ভব। এটা জন্মদাগ কমাতে সরাসরি রক্তনালীতে কাজ করে।

কিছু জন্মদাগ তুলে ফেলতে সার্জারির প্রয়োজন হয়, যেমন- গভীরতর হেমানগিওমাস, যা এর পার্শ্ববর্তী সুস্থ টিস্যুকে ড্যামেজ করতে পারে। সার্জারির মাধ্যমে জন্মদাগ অপসারণের পর স্কার কমাতে টিস্যু এক্সপানশনের প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে অপসারিত জন্মদাগের পাশে সুস্থ ত্বকের নিচে বেলুন প্রবেশ করানো হয়। এটা নতুন সুস্থ ত্বকের বিকাশসাধনে সাহায্য করে। চিকিৎসক যখন প্রয়োজন মনে করবেন ওটা খুলে নেবেন।

Advertisement