চট্টগ্রামে এক বছরে দেড় হাজার মামলায় পিবিআই এর নিষ্পত্তি ১,২৮৬

দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তে আদালতের আস্থা পিবিআইয়ে

1846
 জালালউদ্দিন সাগর |  বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১ |  ৪:৩১ অপরাহ্ণ

এক : ১৩ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে শুভকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে সুদূর নাটোর থেকে সস্ত্রীক চট্টগ্রামে এসেছিলেন দিনমজুর রফিকুল ইসলাম। স্বপ্ন পূরণে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যে মানুষটি চট্টগ্রামকেই নিরাপদ আশ্রয় মনে করে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তিনি কী কখনো ভুলেও ভেবেছিলেন সেই শহর কেড়ে নেবে তার জীবন! সন্তানের ভবিষ্যৎ। কিংবা বুননেই স্বপ্নের মৃত্যু। বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে যেই শহরে আসা, সেখানেই পড়ে থাকে পচনধরা মরদেহ রাস্তার পাড়ে, ব্রিজের পাশে! যে স্বপ্নের আশায় মানুষের পথচলা, সেই স্বপ্নই কাল হয়ে ওঠে কারো কারো জীবনে!

২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে ভাটিয়ারি ইউনিয়নের বিএমএর উত্তর পার্শ্বে হাটহাজারী-সীতাকুণ্ড সংযোগ সড়কের পাশ থেকে রফিকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পেটে বুকে ধারালো অস্ত্রের কোপ। রক্তাক্ত দেহ। নিথর রফিক! নিথর একমাত্র সন্তানের স্বপ্নময় ভবিষ্যতও।

Advertisement

সেই রাতেই নিহত রফিকের স্ত্রী উম্মে সালমা স্বামীর মরদেহ সনাক্ত করতে আসেন সীতাকুণ্ড থানায়। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন স্বামী হারানোর শোক, হঠাৎ প্রিয় মানুষটি নেই ভাবতেই ছেলে শুভর স্বপ্ন ভঙ্গের আতঙ্কে উম্মে সালমার আর্তনাদ আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে থানা। ওই রাতে চোখভরা জল শুধু উম্মে সালমার চোখেই গড়ায় নি , গড়িয়েছে ছেলে শুভসহ থানার দায়িত্বরত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের চোখের পানি। নিজে বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামী করে সীতাকুণ্ড থানায় মামলাও করেন তিনি। স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে আসামীদের ধরতে আকুতি করেন পুলিশের কাছেও।

প্রায় নয় মাস কেটে গেলেও হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি থানা পুলিশ। অবশেষে নয় মাস পর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআই। থানা পুলিশ না পারলেও পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে ঠিকই বেরিয়ে আসে দিনমজুর রফিকুল ইসলাম নিহত হওয়ার লোমহর্ষক সেই কাহিনী।

কোনো দুঘর্টনা নয়, ঘাতক কোনো আগন্তুকও নয়। দিনমজুর সেই রফিকের বুকে ছুরি চালিয়ে ছিল তারই বন্ধু সাকিব ও ভাড়াটিয়া খুনি এমরান! আর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদারকি করেছিলেন তারই স্ত্রী উম্মে সালমা নিজেই!

৪২বছরের রফিকের সাথে বন্ধুত্ব ছিলো ২০ বছর বয়সী শাকিবুল ইসলাম সাকিবের। রফিকের বাসায় আসা-যাওয়া ছিলো তার। সে সুযোগে শাকিবের সাথে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ায় উম্মে সালমা। বিষয়টি জেনে যাওয়ায় রফিককে হত্যার পরিকল্পনা করে শাকিব ও সালমা। ৪০ হাজার টাকায় ভাড়া করেন এমরান নামে একজনকে। পরে তিনজনে মিলে বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করে রফিককে। এমনি এক হৃদয়বিদারক কাহিনির বর্ণনা করলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিদর্শক মো. কামাল আব্বাস। বলেন,ইতোমধ্যে তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবনন্দি দিয়েছেন।

দুই : ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসে নিখোঁজ হন হেলাল উদ্দিন। ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর হেলাল উদ্দিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর এলাকায় নিখোঁজ হওয়ার বছর পেরিয়ে গেলেও হেলালের কোনো সন্ধান পায়নি ভূজপুর থানা পুলিশ। আদালতের নির্দেশে একই বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআই। ধীরে ধীরে জট খুলে সেই মামলার।

নিখোঁজের এক বছর পর ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর ফটিকছড়ির গহীন অরণ্যের পাহাড়ি খাঁদ থেকে হেলালের কঙ্কাল উদ্ধার করে পিবিআই। এর আগে গ্রেফতার করা হয় ঘটনার সাথে জড়িত দুইজনকে।

তিন : ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্ণফুলি থানা এলাকায় বাউন্ডারি টপকে বাড়িতে প্রবেশ করে নগদ অর্থসহ প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ টাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা। শুধু লুট করে ক্ষান্ত হয়নি দুর্বৃত্তরা একই সময়ে ঘরের নারীদের বেঁধে করে গণধর্ষণ ।

একই বছর ২৫ ডিসেম্বর স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি তদন্ত শুরু করে চট্টগ্রাম পিবিআই মেট্রো। গ্রেফতার করা হয় ঘটনার সাথে যুক্ত ৪ জনকে। পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর ৬জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই।

চার : ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৭টায় নগরীর সদরঘাট এলাকায় দেশিয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর ও কুপিয়ে সুদীপ্ত বিশ্বাস নামে একজনকে জখম করে অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারীরা। এর পর ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় সুদীপ্ত বিশ্বাসের।

পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় মামলাটি তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই এবং চলতি বছর ১৪ জানুয়ারি ২৪ জনকে আসামী করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

পাঁচ : নগরীর হালিশহর আবাসিক এলাকায় ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ রাতে খুন হন বুটিক ব্যবসায়ী নারী উদ্যোক্তা লাকী আকতার। দোকানে রাখা মসলার চেছনি দিয়ে আঘাত করে লাকী আকতারকে হত্যা করে তারই কর্মচারী খালেদ নুর।

হালিশহর থানা পুলিশের পাশাপাশি স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার তদন্তে নামে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো। হত্যাকাণ্ডের একমাস পর কক্সবাজার থেকে খুনিকে গ্রেফতার করে পিবিআই মেট্রো অঞ্চলের তৎকালীন পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি।

শুধু উল্লেখিত ঘটনাগুলোর মামলাই নয়-এমন অসংখ্য আলোচিত এবং সমালোচিত মামলার সফল তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান হলো পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

করোনা মহমারির দীর্ঘ সময় আদালতের কার্যক্রম সীমিত থাকার পরেও আদালত থেকে পাঠানো মামলার আধিক্য দেখে বিস্মিত স্বয়ং পিবিআই কর্মকর্তারা। তাদের অভিমত, বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের কারণে আদালতের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে পিবিআই।

পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম মেট্রো’র পুলিশ সুপার (এসপি) নায়মা সুলতানা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে যে মামলাগুলোর তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছি তার সবগুলোই আদালত গ্রহণ করেছেন। পিবিআইয়ের তদন্তে নিরপেক্ষতা আছে বলেই আদালতে আস্থার জায়গাটি ধরে রাখতে পেরেছে পিবিআই।

একই মন্তব্য করেন পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) নাজমুল হোসেন। তিনি বলেন, সীমিত সংখ্যক লোকবল থাকার পরও গুরুত্ব দিয়েই প্রতিটি মামলার গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করে পিবিআই। সেকারণে পিবিআইয়ের প্রতিটি তদন্তকাজই সফল।

পিবিআই থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২০ সালে এক হাজার চারশ ৫৮ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা অঞ্চল। তারমধ্যে এক হাজার একশ ৩৪টি মামলা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি করেছে পুলিশের এই শাখাটি। ২০২০ সালে ৯৬২ মামলার তদন্ত রিপোর্টের জন্য পিবিআইকে আদেশ দেন আদালত। এছাড়া পিবিআই ও পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশ এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে ১৭২ টি মামলা গ্রহণ করে পিবিআই। যার মধ্যে নিষ্পত্তি করেছে একশ ১১টি মামলার।

২০২০ সালে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো আদালত থেকে প্রাপ্ত (সিআর) ৬৭০টির মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি করেছে ৫৫৩টি মামলা। জিআর মামলা (সদর দপ্তরের নির্দেশ এবং স্বপ্রণোদিত) গ্রহণ করেছে ৯২টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৭০টি।

চট্টগ্রাম জেলায় সিআর (আদালত থেকে প্রাপ্ত) মামলার সংখ্যা ৬১৬টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪০৯টি মামলার। জিআর মামলা (সদর দপ্তরের নির্দেশ এবং স্বপ্রণোদিত) গ্রহন করেছে ৮০টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৪১টি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন এ এম আবু নোমান বলেন, পিবিআই হচ্ছে বিশেষায়িত একটি ইউনিট। তাদের কাজই হচ্ছে গুরুত্ব দিয়ে মামলা তদন্ত করা। এই বিশেষত্বের কারণেই পিবিআই আদালতের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা সফলতার সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই এবং সে মামলাগুলো দেশজুড়ে আলোচিতও হয়েছে।

জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান উপ-মহা পরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার বলেন, পিবিআই যেকোনো মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষকেই সমানভাবে প্রাধান্য দেয়। ভিকটিম যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় ঠিক তেমনি কেউ মিথ্যা অভিযোগ করে যাতে কারো ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই পিবিআই সব মামলা তদন্ত করে। যোগ করেন বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা।

এসএম

Advertisement