পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ

ফুটপাতে স্ট্যান্ড, রাস্তায় গাড়ি, দুর্ভোগে পথচারী

375
 শাহাদাত রিফাত |  সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১ |  ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ

সড়কে চলে যানবাহন আর ফুটপাত ধরে চলাচল করে মানুষ। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক হলেও ক্ষমতা আর টাকার দাপটে এখন স্বাভাবিকভাবে টেম্পু চলে ফুটপাতে। দিনের পর দিন অনিয়মকে নিয়ম করে চলা ভিন্ন এই চিত্রটি দেখা যায় নগরের নতুন ব্রীজ এলাকার বাস স্ট্যান্ডে।

নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের চলাচলের অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা নতুন ব্রিজ এলাকাটি। কক্সবাজার, বান্দরবান ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের আসা যাওয়ার প্রধান সড়কপথও এটি। তাই সবচেয়ে বেশি মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই এলাকা। দিন রাত সবসময়ই গিজগিজ করে মানুষ। যে বাসস্ট্যান্ডে এত পথচারী, সেখানেই সুযোগ নেই ফুটপাত ধরে হেঁটে চলাচলের।

Advertisement

দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলদারদের দখলে এ এলাকার ফুটপাতগুলো। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ফুটপাতজুড়েই উঠে আছে বাস-টেম্পু। পথচারীদের হাঁটার জায়গা দখল করে স্ট্যান্ড বানিয়েছে অবৈধ দখলদাররা। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার মতো পরিস্থিতিও নেই সেখানে। তাই বাধ্য হয়ে পথচারীরা চলাচল করছেন মূল সড়কে। যে কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। সেই সঙ্গে পথচারীদের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

এসময় নতুন ব্রিজ এলাকার মূল সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ রাবেয়া খাতুন। পেছনেই সিএনজি অটোরিকশাচালক হর্ন বাজিয়ে বলছিলেন ‘আপা একটু সাইড দিয়ে হেঁটে যান।’ চালকের কথা শুনে রাবেয়া খাতুন বলেন ‘কোথায় যাব? ফুটপাতে স্ট্যান্ড, রাস্তায় গাড়ি, বিপাকে আমাদের মতো পথচারীরা।’

কথা হয় রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, পুরো নতুন ব্রীজ এলাকার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি নেই। সবগুলো ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে আছে বাস টেম্পু, তার মধ্যে মানুষের হেঁটে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অভিযোগ পাওয়া যায়, প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে চলে এসব অপকর্ম। যানবাহনগুলো ফুটপাত দখল করে থাকলেও এর নেপথ্যে আছে প্রশাসনের আঁতাতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মালিক ও চালকরা এসব সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি আর প্রতিদিনই চলছে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কারণে বারবার আলোচনা হলেও দখলমুক্ত হয় না ফুটপাতগুলো।

পথচারীদের চলাচলের জন্য থাকা ফুটপাতে কেন আপনাদের গাড়ি রাখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে নতুন ব্রিজ এলাকার টেম্পু চালক মিজান বলেন, টাকা দিয়ে এখানে গাড়ি রাখছি, আবার প্রতিদিন চাঁদাও দিতে হয়। মানুষজন তো রাস্তার পাশ ধরে হেটে যেতে পারছে । প্রথমে গাড়ির ভর্তি বাবদ টাকা দিই আমরা। সেইসাথে প্রতিমাসে আমাদের মালিকরা পুলিশ ও সমিতিকে  তো টাকা দিচ্ছেই। আবার প্রতিদিন লাইনম্যানকেও আমাদের টাকা দিতে হচ্ছে। টাকা দেয়া ছাড়া তো আমরা এখানে গাড়ি রাখছিনা।

আরেক টেম্পু চালক মোস্তফা। দীর্ঘদিন ধরে নতুন ব্রিজ থেকে বহদ্দারহাট রুটে মাহেন্দ্র গাড়ি চালান। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকা ছাড়া এইখানে একটি গাড়িও ঢুকতে পারে না। মালিকরা টাকা দিয়ে পুলিশ সহ সব ম্যানেজ করছে। আমরা টাকার বিনিময়ে গাড়ি চালাই। পুলিশকে প্রতি গাড়ির জন্য দেড় থেকে ২ হাজার টাকা করে মাসে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। লাইনম্যানকেও প্রতিদিন গাড়ি প্রতি ৫০ টাকা করে দিতে হয়।

সাংবাদিক পরিচয়ে দায়িত্বে থাকা লাইনম্যানদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি। উল্টো তারা জানান, তারা লাইনম্যানের কাজ করেননা। এমন কাউকে তারা চিনেনও না।

পরে অনুসন্ধানে পাওয়া যায় আফছার নামের এক লাইনম্যানের মুঠোফোন নাম্বার। ফোন করা হলে তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন তিনি লাইনম্যানের কাজ করেন।

আফছার সিটিজিনিউজকে বলেন, আমরা এইখানে কোনো বেতন পাইনা। প্রতি বাস, টেম্পু থেকে ৩০ থেকে ৫০ টাকা করে পাই। আর মালিক সমিতিকেও প্রতি মাসে টাকা দিতে হয়। শুধু আমি নয়, এইখানে আরো ৭-৮ জন লাইনম্যানের কাজ করে।

লাইনম্যানদের নাম ও পুলিশের মাসিক চাঁদা’র বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ে কি আমি বলবো? আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, সব জানবেন।’ বলে তিনি  কল কেটে দেন।

পরে অন্যান্য লাইনম্যানদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে প্রতিদিন বহদ্দারহাট, কোতোয়ালীসহ কয়েকটি রুটে দুইশো’র অধিক মাহেন্দ্র ও সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চলাচল করে। আর এই গাড়িগুলোর সিরিয়ালসহ নানা বিষয় তারা দেখাশুনা করেন। তাই তারা প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা করে নেয়। তবে পুরো টাকা তারা পায় না। তাদের এই টাকাতেও ভাগ বসায় কয়েকটি প্রভাবশালী মহল। তবে এ নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ নেই। তাদের দাবি প্রভাবশালীদের কারণে লাইন চলে। আর লাইন চললে তাদের কাজ আর আয় থাকে।

ফুটপাত দখল করে এমন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক সিটিজি নিউজকে বলেন, সিটি কর্পোরেশনের কাজ হলো পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ফুটপাত তৈরি করে দেয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা। দখলদাররা তা দখল করলে, মুক্ত করার দায়িত্ব পুলিশ বিভাগের।

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)র উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সিটিজি নিউজকে বলেন, নতুন ব্রিজ এলাকায় জনদুর্ভোগ কমাতে আমরা অনেক কাজ করেছি। আগে যেখানে ২০ থেকে ২৫ মিনিট ধরে যানজটে গাড়ি লাইন ধরে থাকতো, সেটা এখন কমে অনেকটা শূন্যে এসে গেছে বলা যায়। তবে সফল বলা গেলেও ১০০ ভাগ দুর্ভোগ কমাতে পারিনি। কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। আমরা সেগুলো সমাধান করার জন্য অনেক গুলো পদক্ষেপ নিয়েছি।

পুলিশকে মাসোহারা দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট এমন কোনো অভিযোগ থাকলে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবো। এ ধরনের কোনো কাজে পুলিশের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কেএন

Advertisement