‘‘সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাস্বত্ত অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন’’

501
  |  শুক্রবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২১ |  ৫:২০ অপরাহ্ণ

প্রসংগ কথা: গবেষনা জালিয়াতি

লেখক : ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী

ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী
Advertisement

সম্প্রতি গবেষনা জালিয়াতির জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষকের পদাবনতি হয়েছে। এটি একটি বার্তা দিয়েছে- অবশেষে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট (মেধাস্বত্ত অধিকার)’ নিশ্চিতকরণের ব্যাপারে সচেতনতা আসছে। তবে মেধাস্বত্ত অধিকার লংঘনের কারণে এ ধরনের প্রতীকী শাস্তি বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার পরিবেশ তৈরীর পথ সহজ করবে বলে মনে হয় না। উন্নত বিশ্বে এ ধরণের  মেধাস্বত্ত অধিকার লংঘনের দায়ে ডিগ্রী বাতিল হয়ে যায়, টিচিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জেলেও যেতে হয়। সেখানে বুদ্ধিভিত্তিক চর্চায় জালিয়াতি (প্লেজারিজম)কে সহজ বা নমনীয়ভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই সে প্রেক্ষাপটে ভাবলে শাস্তির মাত্রা যথাযথ হয়নি বলে মনে হয়েছে।

মেধাস্বত্ত অধিকার নিশ্চিতকরণ সংক্রান্তে আমার একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এএনইউ) থেকে অর্থনীতিতে আমি তিনটি ডিগ্রী (পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, এমএস ও পিএইচডি) অর্জন করেছি। এ ডিগ্রী অর্জনের পথ খুব সহজ ছিলনা- অনেক শ্রম, অধ্যবসায় ও বুদ্ধিবৃত্তির কঠোর চর্চার ফলাফল এ তিনটি ডিগ্রী। এএনইউ’তে সব লেখা/ এসাইনমেন্ট/ গবেষণা পত্র- আমাদের সবাইকে ‘টার্ন-ইট-ইন’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে একাডেমিক স্কিল এডভাইজারের এর কাছে বাধ্যতামূলকভাবে সাবমিট করতে হয়েছে। একাডেমিক স্কিল এডভাইজারের ছাড়পত্র যতক্ষণ পাওয়া যায় না, পরীক্ষার মূল্যায়নের জন্যে অনলাইনে চূড়ান্ত সাবমিশন করা যায় না। তাই ডেডলাইন এর আগে হাতে সময় রাখতে হতো, যাতে একাডেমিক স্কিল এডভাইজারের মতামত পাওয়ার পর কোনো কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করার জন্য। অনলাইনে ডেডলাইন চলে গেলে সাবমিশন ব্লক হয়ে যায়।

আমাদের সময়ে এক স্টুডেন্ট (দক্ষিণ এশিয়ার অতি চালাক মানুষ) প্রযুক্তিগত অসুবিধার কারণ দেখিয়ে হার্ড কপি সাবমিট করার বিশেষ অনুমতি নেয়। সে ভেবেছিলো, হার্ড কপি সাবমিট করলে ওরা হয়তো সফট কপি চাইবে না। কিন্তু তাকে পরবর্তীতে সফট কপি জমা দিতে হয়। এতে প্লেজারিজম ধরা পড়লে তাকে অনেক কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। কেননা এতে সে লজ্জিত না হয়ে উল্টো নিজের লেখা বলে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলো। তার আচরণে সবাই বুঝতে পারে সে চালাকি করেই হার্ড কপির মাধ্যমে পরীক্ষা পাশের বৈতরনী পার হওয়ার চেষ্টায়- ইচ্ছা করেই ডেডলাইন মিস হওয়ার নাটকের অবতারণা করেছিল।

সবচেয়ে বড় কথা, উন্নত দেশে প্লেজারিজমের জন্য ডিগ্রি বাতিলসহ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে জেলেও যেতে হয়। মেধাস্বত্ত অধিকার সেখানে শক্তভাবে মনিটর করা হয়। উন্নত দেশগুলোর শীর্ষ তালিকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করে বলেই সেখানে ভালো গবেষক তৈরী হয় এবং তাদের গবেষণার মান কেমন তা সহজেই অনুমেয়।

তবে মেধাস্বত্ত অধিকার শুধু গবেষকের ক্ষেত্রে নয়- এর পাশাপাশি লেখালেখির সকল ক্ষেত্রে, সকল পেশায় এ ইস্যুটি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখির ক্ষেত্রেও এ ইস্যুটি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। যেমন: ফেসবুকে দেখা যায়- লেখার সোর্স উল্লেখ না করে একজনের লেখা আরেকজন হুবহু কপি-পেস্ট করে নিজের স্ট্যাটাস হিসেবে দিয়ে দেয়। যে কোনো কারো লেখা পছন্দ হলে শেয়ার করা দোষের নয়, কিন্তু হুবহু কপি-পেস্ট এর ক্ষেত্রে উৎসের পরিচয় না দেয়া প্লেজারিজমের আওতায় পড়ে। এছাড়া, যে কোনো লেখায় অবশ্যই তথ্যসূত্র থাকতে হয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ এ বিষয়টি যথাযথভাবে চর্চা করেনা। এতে মূল লেখককে তার মেধাস্বত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

প্লেজারিজমের বিষয়টি কঠোরভাবে না দেখলে এদেশে বিশ্বমানের ভালো গবেষক এবং উন্নত চিন্তা ও মন-মানসিকতার মানুষ তৈরী হতে অনেক সময় লাগবে। এই দেশের মেধাবী সন্তানেরা উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো করছে- কেননা তারা সেখানে মেধাস্বত্ত অধিকার নিশ্চিত করার সকল প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ পায় এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা চর্চা করার সুযোগ পায়। আমি নিজের ক্ষেত্রেও দেখেছি এএনইউ থেকে তিনটি ডিগ্রী অর্জনের পথ পরিক্রমার সকল প্রক্রিয়ায় আমি যে অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করেছি- সেগুলো আমাকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আর সে অভিজ্ঞতাগুলো আমার প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে আমাকে কোনো না কোনোভাবে কাজে দিয়েছে এবং প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে ভ্যালু-এড করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রতিটি কাজ গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পাদন করতে পারলে প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত সেক্টর ও স্টেকহোল্ডারা অনেক বেশি রিটার্ন পায় এবং সার্বিক উন্নয়ন ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু, কাজকে গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে রুটিন কাজের বাইরে কোনো কাজ থাকেনা এবং ভ্যালু-এড করার সুযোগও নষ্ট হয়ে যায়। তাই সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাস্বত্ত অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কেননা দক্ষ গবেষক ও কর্মীবাহিনী তৈরীর জন্যে উন্নত চিন্তা ও মন-মানসিকতার মানুষ তৈরী করার কোনো বিকল্প নাই।

যেহেতু ২০৪১ সালে অর্থাৎ আগামী ২০ বছর পর বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বে উন্নীত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই মেধাস্বত্ত অধিকার নিশ্চিতকরণের সকল প্রক্রিয়া কঠোরভাবে এখন থেকেই অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্যে ‘গবেষণা ও উন্নয়ন’ তথা  ‘Research & Development (R & D)’র কোনো বিকল্প নাই। বাংলাদেশ ‘উন্নয়ন’ এর মহাসড়কে যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, ‘গবেষণা’য় সে গতিতে চলার ক্ষেত্রে এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে- যার মধ্যে অন্যতম ‘মেধাস্বত্ত অধিকার’ নিশ্চিতকরণের বিষয়টি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সরকারের যুগ্মসচিব।

বর্তমানে: সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য), বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

Advertisement