এতো জোরে কেউ হাত ধরে মা? বলেই কেঁদে ফেললো মেয়েটি

2264
 জালালউদ্দিন সাগর |  সোমবার, এপ্রিল ১৯, ২০২১ |  ৪:২৬ অপরাহ্ণ

প্রায় ২০ দিন স্ত্রী’র সাথে সরাসরি দেখা হয়নি ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মোর্শেদ চৌধুরী। মেয়ে জুমকে নিয়ে একাই থাকতেন নগরীর শিশু একাডেমি সংলগ্ন হিলভিউ আবাসিকের নাহার বিল্ডিংয়ের সপ্তম তলার বাসাটিতে। শাশুড়ি করোনা আক্রান্ত হওয়ায় দেখাশুনার জন্য স্ত্রী ইশরাত জাহানকে পাঠিয়ে দেন শ্বশুরবাড়িতে। মুঠোফোনের ভিডিও কলেই দেখা ও কথা হতো স্ত্রীর সাথে।

৬ এপ্রিল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজে গাড়ি চালিয়ে মেয়ে মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুমকে নিয়ে যান শ্বশুরবাড়ি হালিশহরে। গাড়ি থেকে না নেমে মোর্শেদ মেয়েকে শ্বশুরের বাসায় দিয়ে ঘরে ফেরেন।

Advertisement

আলাপচারিতায় জুম জানান, জানেন আংকেল নানুবাড়ি যাবার পথে গাড়িতে সারাক্ষণই বাবা আমার হাত ধরে ছিলো। এতো জোরে ধরেছিলো খুব ব্যথা পেয়েছিলাম। তবুও বাবাকে কিছু বলিনি। নানুর বাসায় গিয়ে মাকে জানালাম। বললাম, বাবা আমার হাতে ব্যথা দিয়ে লাল করে ফেলেছে। এতো জোরে কেউ হাত ধরে মা-বলেই কেঁদে ফেললো মেয়েটি।

বলেন,আংকেল একবার যদি বুঝতে পারতাম, চিরদিনের জন্য হাত ছেড়ে দিবেন বলেই এতো জোরে বাবা আমার হাতটি ধরেছিলেন তাহলে কী বাবাকে আমি ছাড়তাম। ছাড়তাম না। কখনোই না। এই বাবা ছাড়া আমাকে আগলে রাখার আর কে আছে বলুন ? প্রশ্ন করেন জুম।

ক্লাস সিক্সে পড়া ছোট এই মেয়েটির এতো বড় আর কঠিন প্রশ্নের জবাব ছিলো না আমার কাছে। ওঠে পড়ি তার সামনে থেকে। ওর মতো ছোট একটি মেয়ের সামনে আমার মতো মধ্যবয়সী একজন মানুষের চোখের জল খুব কি মানায়!

তখনো আমরা কেউ একবারের জন্যও বুঝেতে পারিনি কী উতালপাতাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে মোর্শেদের বুকে। যন্ত্রণাকে কতটা অসহ্য মনে হলে একজন সুস্থসবল মানুষ ফ্যানের সাথে রশি বেঁধে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে স্ব চোখে না দেখলে বুঝতাম না। যোগ করেন ইশরাত জাহান।

বলেন, মেয়েকে নানার বাড়ি দিয়ে ঘরে ফেরেন মোর্শেদ। রাতে মুঠোফোনের ভিডিও কলে কথাও বলেন মেয়ে ও আমার সাথে। বুধবার সকালে ভাসুরের ফোন পেয়ে মেয়েকে নিয়ে ছুটে আসি ফ্ল্যাটে। আমাদের সাথে কথা বলার পর রাতের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যা করেছে মোর্শেদ। যোগ করেন ইশরাত। অই ফ্যানের পাখাতে মোর্শেদের সাথে সাথে স্বপ্নগুলো ঝুলছিলো আমাদেরও ! কোথায় যাবো এখন আমি? কোথায় যাবে আমাদের এই মেয়েটি।

২০০৫ সালের ২৪ মার্চ পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় মোর্শেদের সাথে। আমার ডাকনাম জুলি। জুলি আর মোর্শেদ মিলিয়ে মেয়েটির নাম জুম রাখে ওর বাবা। বলেন ইশরাত।

সব কিছু খুব ভালোই চলছিলো। অসম্ভব রকমের ভালোবাসতেন আমাদের। পরিবারের প্রতি অন্যরকম দরদ ছিলো জুমের বাবার। মেয়েটাকে সব সময় বেঁধে রাখতো বুকে।

হঠাৎ করে এমন কী হয়েছিলো জানতে চাইলে ইশরাত বলেন, আত্মীয়দের বিশ্বাস করাই কাল হলো আমার সংসারের। বিশ্বাসই ধ্বংস করে দিলো পুরো পরিবারকে।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের দিকে মোর্শেদের ফুফাত ভাই পারভেজ ইকবাল ও জাবেদ ইকবাল থেকে ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং সাকিব ও মইনউদ্দিননের কাছ থেকে ১২ কোটি ৬০ লাখ ১৫ হাজার ধার নেয় মোর্শেদ। এতো টাকা ওরা মোর্শেদকে কেন দিয়েছিলা বা মোর্শেদই বা কেন নিয়েছিলো জানা ছিলনা আমাদের।

২০১৮ সালের দিকে অর্থ লেনদেনের কথা আমাকে জানায় মোর্শেদ। এর পর বিভিন্নধাপে সুদসহ পারভেজ ও ইকবালকে পরিশোধ করা হয় ১৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। সাকিব ও মইনউদ্দিনকে দেওয়া হয় ১২ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। ওদের কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা ধার নেওয়ার বিপরীতে কয়েকধাপে মোর্শেদ ওদের পরিশোধ করেছিল প্রায় ৩৫ কোটি টাকারও বেশি।

ধারের বিপরীতে অতিরিক্ত ১৩ কোটি টাকা পরিশোধ করার পরও আরও টাকার জন্য মোর্শেদকে চাপ দেয় ওরা। দেয় হুমকি। ২০১৯ সালের ২৯ মে জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর পুত্র নাজমুল হক চৌধুরী ওরফে শারুন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুসহ দুটি গাড়িতে করে ১০-১২ যুবক হামলা চালায় আমার বাসায়।

পারভেজ ইকবাল দলের অন্যদের নিয়ে লিফটে ওপরে উঠে বাসার দরজা ধাক্কাতে থাকেন। এ সময় দরজা খুলতে না চাইলে লাথি মারতে থাকেন তারা। নিজের ও শিশুকন্যার নিরাপত্তার জন্য দরজা খুলতে না চাইলেও দরজার অন্য প্রান্ত থেকে হুমকি দিয়ে পারভেজ ইকবাল দরজা খুলতে চাপ দিতে থাকেন। শুধু শারুন, বাচ্চু, জাবেদ, পারভেজ, সাকিব বা মইনউদ্দিনই নয়-পরবর্তীতে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে ওদের সাথে যুক্ত হয় পুলিশও।

ওদের সেই হুমকি মোর্শেদ ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় ঘর পর্যন্ত। ইনস্টলমেন্ট দিতে না পারলে তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় আমাকে ও আমার মেয়েকে। যোগ করেন ইশরাত।

ইশরাত আরও বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধারাবাহিক হুমকি সহ্য করতে না পেরে আমি একদিন বলেছিলাম, তুমি দেশের বাইরে চলে যাও। জাবাবে মোর্শেদ বলেছিলো, আমি যদি দেশ থেকে পালিয়ে যাই ওরা তোমাকে এবং আমার মেয়েটাকে কুড়ে কুড়ে খাবে। ওরা অমানুষ!

ওরা যাতে আমি ও আমার মেয়েকে কুড়ে কুড়ে খেতে না পারে সেজন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলো মোর্শেদ। যোগ করেন ইশরাত জাহান।

আরও বলেন, প্রতিমূহূর্তে হুমকি দেওয়া হতো সময় মত ইনস্টলমেন্ট দিতে না পারলে পুলিশ পাঠিয়ে মোর্শেদকে তুলে নিয়ে যাবে। এই হুমকি যে শুধু জাবেদ,পারভেজ,সাকিব দিতো তা কিন্তু নয়। হুমকি দিতেন উপ-পুলিশ কমিশনার বিজয় বসাকও। মুঠোফোনে অকথ্যভাষায় গালাগালি করেছেন মোর্শেদকে এই পুলিশ কর্মকতার্।

তিনি বলেন, মোর্শেদ মারা যাওয়ার আগে আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই করোনা আক্রান্ত ছিল। অনেকেই ভর্তি ছিলো পার্কভিউ হসপিটালে। সে সময় মোর্শেদ হাসপাতালে থেকে তাদের দেখাশোনা করেছিলো। হাসপতালে থাকাকালীন সময়ে বিজয় বসাক স্যার মোর্শেদকে মুঠোফোনে পুলিশ পাঠিয়ে ধরে আনার হুমকি দেন।

মুঠোফোনে মোর্শেদ বিজয় বসাক স্যারকে অনুনয় করে বলেছিলেন, স্যার আমাকে ধরে আনতে হবে না। আপনি ডাকলে আমিই আসবো। প্রতিউত্তরে বিজয় বসাক বলেছিলেন, তোকে আসতে হবে না। পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকে পুলিশ পাঠিয়ে তোকে ধরে আনবো। তুই একটা বিশ্ব চিটার।

ইশরাত হাজান কিছুটা ক্ষেপে গিয়েই এই প্রতিবেদককে জানান, মধ্যস্ততাকারী হিসেবে পুলিশের উপ-কমিশনার বিজয় বসাক জানতেন পাওনা টাকার চেয়েও প্রায় ১৩ কোটি টাকা বেশি দেওয়া হয়েছে ওদের। তার পরও কেন আরও টাকা দিতে হবে?

কোনো মামলা ছাড়া,ওয়ারেন্ট ছাড়া একজন স্বাধীন দেশের নাগরিককে এভাবে তুলে আনার হুমকি কিভাবে দিতে পারেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা? প্রশ্ন ছোড়েন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-পুলিশ কমিশনার বিজয় বসাক এই প্রতিবেদককে বলেন, মামলা চলমান থাকায় এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারবো না।

হুইপ পুত্র শারুন বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি এই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নই।

মানবাধিকার কর্মী আমিনুল ইসলাম বাবু বলেন, মোর্শেদকে যারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে এটাও দেখতে হবে এতো টাকা ওরা মোর্শেদকে কেনইবা দিয়েছে।

এসএম

Advertisement