এপ্রিল ফুল কী ও কেনো?

44
 সিটিজিনিউজ ডেস্ক: |  শুক্রবার, এপ্রিল ২৩, ২০২১ |  ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

পহেলা এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘এপ্রিল ফুল’। অনেক অনেক বছর ধরেই এই বোকা বানানোর দিনটি চলে আসছে। কিন্তু কীভাবে এবং কেন শুরু হয়েছিল এ প্রথাটি? এর ইতিহাস নিয়ে অনেক রকমের কাহিনী প্রচলন রয়েছে। তবে সব কাহিনীর মধ্যে একটি ইসলামবিরোধী কাহিনী উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান সমাজে ব্যাপক পরিমাণে জনপ্রিয়। অনেকেই যাচাই না করে এ গল্প বিশ্বাস করে বসে আছে। কিন্তু কাহিনীটি একদমই সত্য নয়। এপ্রিল ফুল নিয়ে অনেক অনেক কল্প কাহিনী রয়েছে। সুতারাং প্রচলিত ইসলামবিরোধী কাহিনীটি ছাড়াও আরও কাহিনী জেনে নিন।

ক্যালেন্ডার পরিবর্তন
এটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত কাহিনী। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স তাদের ক্যালেন্ডার চেঞ্জ করে। এর আগে বছর শুরু হতো মার্চের শেষে। কিন্তু এটা এগিয়ে নিয়ে আসা হয় আর বছর শুরু করা হয় ১ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু নতুন এই পরিবর্তন অনেকেই মানতে পারলেন না। তারা এই সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন যে, ২৫ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত তারা আগের মতোই নববর্ষ পালন করবে। কিন্তু যারা পরিবর্তন গ্রহণ করেছিল তারা ওদের সাথে মজা লুটতে চাইল। যারাই তখন নববর্ষ করতে চেয়েছে তাদের পিঠে পেপার ফিশ লাগিয়ে দিয়েছে। সেই তখন থেকে ভিক্টিমদের বলা হতো এপ্রিল ফিশ। এমনকি এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে এ নামেই তাদের ডাকা হয় যারা এই দিনে বোকা বনে যায়।

Advertisement

আপাতদৃষ্টিতে এই কাহিনী গ্রহণযোগ্য মনে হলেও ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই কাহিনীর ত্রুটিও ধরা পরে।

রোমান মিথ
রোমান মৃত্যু দেবতা প্লুটো যখন তার ‘স্ত্রী’ পারসিফন-কে অপহরণ করে আনলেন, তখন পারসিফনের মা সেরিস মেয়েকে অনেক খুঁজতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বোকার মতো অনেক খুঁজেও পেলেন না মেয়েকে। কারণ মেয়ে তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডে, মাটির উপরে না। সেরিসের বোকামি স্মরণ করে ১ এপ্রিল বোকামি দিবস পালন করা হতো বলে অনেকে মনে করেন।

বাইবেলের মিথ
হযরত নূহ (আঃ) এর কাহিনী থেকে এই থিওরি এসেছে। নূহ (আঃ) যখন দেখলেন পানি কমছে না, তখন তিনি একটি কবুতর পাঠান দেখার জন্য কবুতর ফিরে আসে কিনা, ফিরে আসলে সেটা হবে ডাঙ্গা খোঁজার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ডাঙ্গা পেলে কবুতর ফিরবে না। কিন্তু কবুতর ফিরে এল। নূহ (আঃ) ‘বোকা’ বনে গেলেন। এটা স্মরণ করে এপ্রিল ফুল পালন করা হতো বলে কেউ কেউ বলেছেন।

ব্রিটিশ গথাম থিওরি
ব্রিটিশ লোককথা বলে, ব্রিটেনের নটিংহ্যামশায়ারের ‘গথাম’ শহর ছিল বোকাদের শহর। এখানে খালি বোকারা বাস করত। ত্রয়োদশ শতকের দিকে নিয়ম ছিল, ব্রিটেনের রাজা যেখানে যেখানে পা রাখবেন তা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। যখন গথামবাসীরা শুনল রাজা জন আসছেন এ শহরে, তারা বলল, তাকে ঢুকতে দিবে না, তারা কিছুতেই গথামকে হারাবে না। রাজা ক্ষেপে গেলেন, সৈন্য পাঠালেন।

যখন সৈন্য এল শহরে, মেইন গেইট থেকে তারা দেখল সারা শহরে হুলস্থূল কাণ্ড। সব বাসিন্দা বোকার মতো কাজ করছে। কিন্তু তারা ফিরে গিয়ে এমন রিপোর্ট দিল যে, রাজা বললেন, এমন বোকাদের শাস্তি দেয়া যায় না। তাই তিনি মাফ করে দিলেন। গথাম স্বাধীন থাকল। গথামবাসীদের ‘ট্রিক’ স্মরণ করা হয় এপ্রিলের ১ তারিখ।

জার্মান থিওরি
১৫৩০ সালের ১ এপ্রিল, জার্মানির অগসবারগ শহরে একটা আইন বিষয়ক মিটিং হবার কথা ছিল। এই মিটিং এর ফলাফল নিয়ে অনেক মানুষ অনেক টাকা বাজিকরের কাছে জমা রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐদিন মিটিং হয়নি। বাজিকর টাকা ফেরত দেয়নি। সব টাকা গচ্চা যায়। এই বোকামি একটা উৎস হতে পারে এপ্রিল ফুলের।

হল্যান্ডের থিওরি
১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল। এদিন হল্যান্ডের ডেন ব্রিএল শহরটাকে লর্ড আল্ভার স্প্যানিশ শাসন থেকে মুক্ত করে ডাচ বিদ্রোহীরা। এইদিন তারা লর্ড আল্ভাকে পুরো বোকা বানিয়ে ছাড়ে। পহেলা এপ্রিলে আল্ভার বোকামি স্মরণ করে এপ্রিল ফুল পালন করা হয়। মূলত এই ঘটনার পর অনেক জায়গায় বিদ্রোহ সোচ্চার হয় আর স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় হল্যান্ড।

স্প্যানিশদের দ্বারা মুসলিম হত্যাযজ্ঞ
আরেকটি মিথ হচ্ছে, ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের পর মুসলমানদের জাহাজে করে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ওই জাহাজগুলোর পরিচালনায় ছিল স্প্যানিশরা। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, কারো দ্বারা মুসলমানদের কোন ক্ষতি হতে দেবে না। কিন্তু জাহাজগুলো মাঝ সমুদ্রে পৌঁছালে স্প্যানিশরাই সকল মুসলমানকে হত্যা করেছিল।

মুসলমানদের স্পেন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল ১৬০৯ সালের পর। অর্থাৎ গ্রানাডার পতনের পর স্পেন থেকে মুসলিমদের ১ এপ্রিল নিরাপদ দেশ ত্যাগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও হত্যা করা হয়েছিল, এমন প্রচলিত ধারণাটির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

শেষ কথা
এসব ঘটনা থেকেই যে ‘এপ্রিল ফুল’-এর প্র্যাংক বা বোকা বানানোর বিষয়টি এসেছে সেটিও শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ নয়। এমনকি এই তত্ত্ব নিয়েও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তবে একটি বিষয় পরিস্কার যে, মুসলিমদের বোকা বানিয়ে খ্রিস্টানরা ১ এপ্রিল তাদের হত্যা করেছিল, এমন তথ্যের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

নানা মিথের ওপর গড়ে ওঠা ‘এপ্রিল ফুল’ পালনের যে সংস্কৃতি তা অনেক সময় সীমা অতিক্রম করে। অপরকে বোকার বানাতে গিয়ে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা কখনও কখনও বিরক্তি এবং অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। আবার কখনও এ ধরনের প্র্যাংক বা বোকা বানানোর ‘নিতান্তই মজার’ কাণ্ড থেকে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

তবে এপ্রিল ফুল দিবস পালন থেকে বিরত থাকার সবচেয়ে বড় যুক্তিটি হলো, এভাবে মানুষকে বোকা বানাতে, মিথ্যা বলতে হয়। মিথ্যা, সেটাই মিথ্যাই। যতই নিস্পাপ হোক না কেন।

এন-কে

Advertisement