জেলা প্রশাসনের ৬০০ টাকার ত্রাণ নিতে ব্যয় ৪০০!

234
 শাহাদাত রিফাত |  শুক্রবার, এপ্রিল ২৩, ২০২১ |  ৭:০৬ অপরাহ্ণ
জেলা প্রশাসনের ত্রাণ বিতরণ
                                          জেলা প্রশাসনের ত্রাণ বিতরণ।  ছবি: প্রিতম নন্দী

‘সরকারের ত্রাণ নিতে হালিশহর থেকে এসেছি। লকডাউনের কারণে রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। তার উপর আমার দুটি পা নেই। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে নিয়ে ৪০০ টাকা রিক্সা ভাড়া করে এখানে এসেছি। কিন্ত ৫০০-৬০০ টাকার এই ত্রাণ নিতে এতদূর থেকে আমাদের এসে উল্টো লোকসান হয়েছে।’ প্রতিবন্ধীদের জন্য জেলা প্রশাসনের দেয়া ত্রাণ নিতে এসে এ অভিযোগ করেন শারীরিক প্রতিবন্ধী তাহের আলী।

শুধু তিনি নন, দূর-দূরান্ত থেকে চকবাজারের কাজেম আলী স্কুলে ৬শ’ টাকার ত্রাণ নিতে এসে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অধিকাংশ প্রতিবন্ধীই।

Advertisement

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও প্রতিবন্ধীদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল ২২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর কাজেম আলী হাইস্কুলে প্রতিবন্ধীদের ত্রাণ বিতরণ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ত্রাণের জন্য যাদের মনোনীত করা হয়েছিলো তাদের আসতে হয়েছে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে। জানা যায়, ত্রাণ নিতে আসা সেই প্রতিবন্ধীদের কেউ এসেছেন নগরীর চান্দগাঁও এলাকা থেকে, আবার কেউ এসেছেন অক্সিজেন থেকে। অনেককে আনা হয়েছে বন্দর, পতেঙ্গা, হালিশহর এলাকা থেকেও।

জেলা প্রশাসনের ত্রাণ নিতে আসা বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধী ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন, যারা জেলা প্রশাসনের ত্রাণ নিতে এসেছে তাদের অধিকাংশ পরিবারই গরীব ও অসহায়। এদের মধ্যে আবার অনেকের হাত-পা নেই। আছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীও। কিন্ত লক ডাউনে রাস্তায় গাড়ি না থাকায় তাদের নিয়মিত ভাড়ার চেয়েও দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে ত্রাণের জন্য চকবাজার আসতে হয়েছে। তাই তাদের অনেকের গুনতে হয়েছে সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া।

কাজেম আলী স্কুলে ত্রাণ বিতরন অনুষ্ঠানে বায়েজিদ থেকে আসা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বশিরের স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, সরকার আমাদের সহযোগিতা করছে, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। কিন্ত এই ত্রান নিতে লকডাউনের মধ্যে বায়েজিদ থেকে চকবাজার আসতে গিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। ৩৮০ টাকা দিয়ে রিক্সা ভাড়া করে এসেছি। রিক্সাওয়ালারা দ্বিগুন টাকা ছাড়া আসেনা। আমাদের ত্রাণগুলো নিজ নিজ এলাকায় দিলে আমাদের জন্য ভালো হতো।

আরেক প্রতিবন্ধী হুসনে আরা সিটিজি নিউজকে বলেন, এমন জানলে আমরা ত্রান নিতে আসতাম না। যে ত্রাণ নিতে আসছি তার থেকে বেশি টাকা আমাদের ভাড়া দিতে হইছে। করোনা থেকে বাঁচতে গাড়ি বন্ধ কিন্ত এখানে সবাই গিজগিজ করছে একসাথে। এখানে কি করোনা নাই? আমরা অন্য সুস্থ মানুষের মত না। আমাদের ত্রাণগুলো বাসায় বা এলাকায় পৌছে দিলে ভালো হতো। এত কষ্টও হতো না আর টাকাও খরচ হতো না।

এদিকে জেলা প্রশাসনের বিতরণ করা ত্রাণের সংখ্যা নিয়েও দেখা গেছে গরমিল। গণমাধ্যমে জেলা প্রশাসনের পাঠানো তথ্যে ৪শ’ প্রতিবন্ধীকে ত্রাণ দেয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে দেয়া হয়েছিলো ৩শ’ জনকে। উপহার হিসেবে দেয়া ত্রাণের প্যাকেটের সংখ্যা ও পণ্য নিয়েও জেলা প্রশাসনের তথ্যে ছিলো অসঙ্গতি। জেলা প্রশাসনের প্রেস রিলিজের তথ্যমতে, ৪০০ জন প্রতিবন্ধীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ৮ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি ছোলা, ২ কেজি আলু, ১ কেজি চিনি ও ১ টি সাবান দেওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ব্যাগে ছিলো পাঁচ কেজি চাল, দুই কেজি চিড়া, এক কেজি সেমাই, এক লিটার সয়াবিন তেল ও দুই কেজি আলু।

তবে ৩শ’ প্যাকেট ত্রাণ দেওয়ার বিষয়টি ত্রান বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে নিজেই স্বীকার করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আ.স.ম জামশেদ খোন্দকার। তিনি বলেছিলেন, আজ একটি বিশেষ শ্রেণীকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। যারা এমনিতে শারীরিকভাবে অনেক সমস্যার সম্মুখীন। তারা এখানে অনেক কষ্ট করে বসে আছেন। তাদের এভাবে এখানে এনে বসিয়ে রাখা শোভনীয় নয়। তারপরও সুন্দর শৃঙ্খলার জন্য আমরা এ প্রক্রিয়ায় ত্রাণটা বিতরণ করছি। মূলত সামাজিক দূরত্ব মানতে এমনটা করছি। আজ যাদের ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তাদের প্রকৃত সংখ্যা ৩০০ জন।

ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ‘বেটার ফিউচার বাংলাদেশ’ নামের সামাজিক সংগঠনটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের তালিকা ও তাদের সহযোগিতায় নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে ত্রাণগ্রহীতাদের নিবার্চন করা হয়। আর পুরো ত্রাণ বিতরণের আয়োজনে তারা জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করে। আজও ৩০০ প্রতিবন্ধী পরিবারকে ত্রাণ দেয়ায় যাবতীয় সহযোগিতা করছে তারা।

স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘বেটার ফিউচার বাংলাদেশ’র সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ সিটিজি নিউজকে বলেন, গাড়ি না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক কষ্ট করে প্রতিবন্ধীরা ত্রাণ নিতে এসেছে তা সত্য। দূরত্বের কারণে পতেঙ্গা ও সিটি গেইট এলাকা থেকে ২০-২৫ জন প্রতিবন্ধী টোকেন পাওয়ার পরও ত্রাণ নিতে আসেনি।

আপনারা কতজনকে ত্রাণ দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সর্বমোট ৩০০ প্যাকেট ছিল। যারা আসেনি তাদের বেচে যাওয়া প্যাকেটগুলো গেইটের বাইরে আসা স্থানীয় দুঃস্থদের বিতরণ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগ ও অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আ.স.ম. জামশেদ খোন্দকারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিবন্ধীদের বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে- এই বিষয়টি আমরা ত্রাণ দেয়ার সময় ফেইস করেছি। আমরা আলোচনা করছি। পরবতীর্তে আমরা উন্মুক্ত স্থানে ত্রাণ বিতরণ আর করবো না। সরাসরি বাসায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করবো।

প্যাকেটে দেয়া ত্রাণ আর প্রেস রিলিজে দেয়া ত্রাণের সংখ্যা ও পণ্যের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আসলে সরকারের একদম সরাসরি যে ত্রাণ, সেগুলো এখনো আসা শুরু হয়নি। আমরা যে ত্রাণগুলো দিচ্ছি তা বড় বড় কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠান থেকে দিচ্ছি। তাদের বলার পর তারা সরাসরি প্যাকেট করে সার্কিট হাউজে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সে কারনে প্যাকেটে দেয়া পণ্যে একটু এদিক ওদিক হতে পারে। আর গতকাল আমরা মাঠে তিনশ’ প্যাকেট ত্রাণ দিয়েছি।

জেইউএস/কেএন

Advertisement