মুনিয়া আত্মহত্যার নেপথ্যেও হুইপপুত্র শারুন!

17601
  |  বুধবার, এপ্রিল ২৮, ২০২১ |  ৭:৪২ অপরাহ্ণ

রাজধানীর গুলশানে তরুণী মোসারাত জাহান (মুনিয়া) আত্মহত্যার প্ররোচনায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের পর এবার উঠে এসেছে চট্টগ্রাম—১২ আসনের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল হক শারুন চৌধুরীর নামও। ইতোমধ্যে মুনিয়ার সাথে শারুনের হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের স্ক্রিনশটগুলো ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

তবে এসব স্ক্রিনশট সম্পূর্ণ ভুয়া বলে উড়িয়ে দেন হুইপপুত্র নাজমুল হক শারুন। তিনি বলেন, মুনিয়া আত্মহত্যা ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। এই স্ক্রিনশটগুলো আমার নয়। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরীক্ষা—নিরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

Advertisement

এ ব্যাপারে এই প্রতিবেদকের কাছে স্ক্রিনশট নিয়ে কোনো নিউজ না করারও অনুরোধ করেন তিনি। শারুন বলেন, স্ক্রিনশটগুলো তো একটি দৈনিকের কাছেও গেছে। কই তারা তো নিউজ করে নাই? তাহলে আপনি কেন করছেন।

সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত এইসব স্ক্রিনশট নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের একাধিক সংস্থা। জিজ্ঞাসাবাদ করেছে শারুনকেও।

বিষয়টি স্বীকার করে শারুন বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে একটি সূত্র তার কাছে কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলো। তবে কে তাকে ফোন করেছিলেন, সে ব্যাপারে হুইপপুত্র কিছু বলতে চাননি।

সূত্র আরও জানায়, শারুনের সঙ্গে মোসারাতের পরিচয় ছিল। গত বছর মোসারাত ফেসবুকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এছাড়া মুনিয়ার বড়বোনও শারুনকে চিনতেন—এমন তথ্যই উল্লেখ ছিলো স্ক্রিনশটে।

এ বিষয়ে জানতে মুনিয়ার বড় বোনকে কল করা হলে মোবাইল রিসিভ করেন তার চাচাত ভাই ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, মুনিয়ার ডায়েরি,মোবাইলসহ বেশ কিছু জিনিস পুলিশ জব্দ করে নিয়ে গেছে। মোবাইলে কি ছিল আমি জানিনা। আপা জানতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আপা এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছেন। উঠলে আপনাকে কল দিতে বলবো। এর পর ঐ নাম্বারে অনেক বার কল দেওয়া হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।

হোয়াটসঅ্যাপে ওই কথোপকথনে মোসারাত মুনিয়া শারুনকে লেখেন, তিনি ভালো নেই। এরপর লেখেন, ‘উনি তো আমাকে বিয়ে করবে না। কী করব আমি?’ জবাবে শারুন লেখেন, ‘আগেই বলেছিলাম, ওর কথা শুনো না। ও আমার বউকে বলছে বিয়ে করবে, কিন্তু করে নাই। মাঝখানে আমার মেয়েটা মা ছাড়া হয়ে গেছে।’

এছাড়াও চ্যাটিং অন্য কেউ দেখলে সমস্যা হবে বলে শারুন মুনিয়াকে এসএমএস করলে মুনিয়া উত্তর দেন ‘জি না। আমি ডিলিট করে দিই সব। সম্রাট চলে যাওয়ার পর আপনিতো জানেন আমি কত কষ্টে ছিলাম। আপনি ঐ টাইমে আমার পাশে না থাকলে আমি কি করতাম জানিনা।”

জবাবে শারুন লিখেন, “ কি যে বলো না। তুমি না থাকলে আমি আমার বউয়ের নিউজ কিভাবে জানতাম? ৫ লাখ, কোনো টাকা না আমার জন্য। তোমাকে তো আমি লাইক করি তুমি তো জানো।

এরপর মুনিয়া লিখেন, ‘‘ওইটা আমি কোনো দিন ভুলবো না। আমার বোন বলছে যে আপনি একটা ফেরেস্তা। আপনার লাইফে আপনার ওয়াইফের আগে যদি আমি আসতাম।’’জবাবে শারুন লিখেন , ‘‘আমি ভালো মানুষ না। জাস্ট উপকার করি।”

আবার মুনিয়ার উত্তর, আচ্ছা উনি যদি আমার ক্ষতি করে আপনি থাকবেন আমার পাশে? আপনার উপরও তো উনি রাগ।
প্রতিউত্তরে শারুন লিখেন, শুনো আমার সাথে জানতো কে থাকে সব সময়। উনি পিএম, উই রাইট হ্যান্ড। বুঝলা? আর জয় ভাই, ববি ভাই আমাকে অনেক দেখতে পারে। কালকেও কথা হলো উনাদের সাথে। আনভীর কী উনাদের থেকে পাওয়ারফুল?এর উত্তরে মুনিয়া লিখেন, আমার না একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। আমি আপনাকে লাস্ট ইয়ারের একটা রের্কড আর কিছু পিকচার দিয়ে রাখি। যদি আমার কিছু হয়। আপনি সবাইকে এটা দিয়েন প্লিজ। আমার আপনার ভিতরে যা হইছে ওইটা কেউ জানবে না। আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন। আমি ভুলবো না। আমি হয়তো আর থাকবো না কিন্তু আমাকে আপনি সেভ করিয়েন।

তখন মুনিয়া ভাইরাল হওয়া আনভীরের ফোন রের্কড ও তার সাথে তোলা ছবি দিয়ে লিখেন , ‘‘আমাকে লাস্ট ইয়ার থ্রেড দিয়েছিলো। ওইটার রেকর্ডিং আছে। আরও ফটো আমি দিচ্ছি আপনাকে। কিছু স্ক্রিনশটও দিচ্ছি। আপনি প্লিজ আমাকে দেখিয়েন। আমাকে দেখিয়েন আমি মারা গেলে।

মারা যাওয়ার কথা শুনে জবাবে শারুন লিখেন, তুমি কিছু করলে বসুন্ধারা গ্রুপ শেষ হয়ে যাবে। আমার নামে নিউজ করাইতেছে কি বাল করতে পারছে? পিএম জানে শারুন কেমন। সো টাইম নাই।ইফতারের টাইম হয়ে যাচ্ছে। আমাকে টেলিগ্রামে নক দিও। ভালো থাকো।

সর্বশেষ মুনিয়া লাভ ইমোজি দিয়ে লিখেন , আপনি আসলে ফেরেশস্তা।কেনো যে আপনার মতো মানুষ আমি পাই নাই লাইফে।

এ বিষয়ে জানতে সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, পরীক্ষা—নিরীক্ষার আগে এর সত্যতা সম্পর্কে বলা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামে ব্যাংক কর্মকর্তা মোর্শেদ চৌধুরী আত্মহত্যার ঘটনায় ফোর্স ডেথের অভিযোগে প্রথম অভিযুক্ত হন হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী। এরপর গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হচ্ছে মুনিয়া আত্মহত্যাও জড়িত শারুন।

গত ১১ এপ্রিল,রোববার শারুনসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফোর্স ডেথের অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহত মোর্শদের চৌধুরীর স্ত্রী ইশরাত জাহান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন ২০১০ সাল থেকে আপন ফুফাতো ভাইদের সাথে ব্যবসা করতে গিয়ে ধার নেওয়া টাকা পুরো পরিশোধ করার পরও অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার অব্যাহত চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন মোর্শেদ। কোনো নথিপত্র ছাড়া অভিযুক্তরা মোরশেদকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেন। মোর্শেদ চৌধুরী ওই টাকার বিপরীতে তাদের ৩৮ কোটি টাকা শোধ করেন। পাওনা টাকার চেয়ে ১৩ কোটি টাকা বেশি দেওয়ার পরও মোর্শেদের উপর ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন চালান আসামীরা।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়িক পার্টনার না হওয়ার পরও হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী ও সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুর অব্যাহত চাপ, হুমকি দিতেন। বাসায় হামলা করলেন। ওদের ফোর্সের কারণেই আমার স্বামী আত্মহত্যা করেছে।

অভিযোগ আছে-শারুনের প্রথম স্ত্রীকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কেড়ে নেন সায়েম সোবহান আনভীর। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে শারুনের বিরুদ্ধে ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরী ফোর্স ডেথের অভিযোগ উঠলে সে বিষয়ে সক্রিয় ছিল বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্টওয়েস্ট গ্রুপের গণমাধ্যমগুলো।

এসএম

Advertisement