কালের আবর্তে খরস্রোতা মাতামুহুরী এখন শীর্ণকায়া

175
 মোস্তফা কামাল |  সোমবার, মে ৩, ২০২১ |  ৬:১৫ অপরাহ্ণ

এক সময় চকরিয়ার মাতামুহুরী নদী দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে স্টিমারসহ অন্যান্য নৌযান চলাচল করলেও এখন তা শুধু গল্পের অতীত। বর্ষা মৌসুমে ২-৩ মাস পানি থাকলেও বাকি ৯ মাস হাঁটুজলে মানুষ পার হয় নদীর এপার ওপার। অধিকাংশ সময় নাব্য না থাকায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে নৌযান চলাচল।

গত ২০ বছর আগেও ঢাকা থেকে কোনো এমপি-মন্ত্রী চকরিয়া-কক্সবাজার এলে  স্পিডবোটে চড়ে আসতেন নদী পরির্দশনে। কিন্তু এখন যাতায়াতে স্পিডবোটের প্রচলন নেই। কারণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীটির মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

Advertisement

এদিকে আলীকদম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩০টিরও বেশি কুম (গভীর পানির স্থল) ছিল। এগুলোর মধ্যে আলীকদমের চেলার কুম, লামার হলইঙ্গার কুম, দুইখ্যা-সুইখ্যার কুম, চকরিয়ার ঘুইন্যার কুম, মোস্তাক মিয়ার কুম উল্লেখযোগ্য। এসব কুমে সব সময়ই ৪০ থেকে ৬০ হাত পানি থাকতো। বন্যা এলে এসব কুমে পানির চোরা বালিতে বড় বড় নৌকাও ডুবে যেতো। অথচ এখন এসব কুম দিয়ে অনায়াসে পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছেন মানুষ।

গত দেড় দশক ধরে অবাধে বৃক্ষ নিধন, বাঁশ কর্তনে পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে নদীতে পড়ে তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং পানি শুকিয়ে নাব্য হারিয়ে নদী হয়ে পড়ছে শীর্ণকায়া মৃতপ্রায়।

কৈয়ার বিল ইউনিয়নের বাসিন্দা জেলে স্বপন দাশ বলেন, আমরা ছোট বেলায় জাল নিয়ে নদীতে গেলে প্রচুর মাছ পেতাম। কিন্তু এখন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা চেষ্টা করেও অর্ধকেজি মাছ পাওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, ২০০০ সালের দিকে এক রাতে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে হামিদুল্লাহ সিদকারপাড়া সংলগ্ন ‘চৌধুরী কুম’সহ প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর অংশ ভরে গিয়ে কুমটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমেও বিভিন্ন কুমে মাছ ধরার জন্য জাক দেওয়া হতো। দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরে জাক ঘেরাও করে মাছ ধরা হত।

ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলে স্বপন দাশ বলেন, যুগ যুগ ধরে এই এলাকার জেলেদের জীবিকার পথের সন্ধান দিয়েছিলো এ নদী। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বহু মানুষ। নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এলাকার মৎস্য ভাণ্ডারেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব এবং দারিদ্রতার চরম হতাশা নেমে এসেছে জেলে পল্লীতেও। তাই মরা মাতামুহুরী এখন আমাদের বুকে দীর্ঘশ্বাস। বর্তমানে পেশা ছেড়ে আমি ছোট একটি চায়ের দোকান করে সংসার চালাই।

এলাকার মানুষ মাতামুহুরী তীরের ফসলের ওপর নির্ভরশীল। উপজেলার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, ফাঁসিয়াখালী, বমুবিলছড়ি, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল ও বরইতলী ইউনিয়নের প্রায় ৬ হাজার ৭০০ একর জমিতে সবজি চাষ হতো। এসব এলাকার ক্ষেত থেকে প্রচুর সবজি নৌকাযোগে পেকুয়া বাজার ও চট্টগ্রাম শহরে নেয়া হতো। কিন্তু এখন অত শস্যক্ষেতও নেই আর সবজি উৎপাদনের বদলে হচ্ছে তামাক চাষ।

অন্যদিকে কৈয়ারবিল ইউনিয়ের বেতুয়া বাজার সংলগ্ন এলাকা মাতামুহুরী নদী কেটে বহদ্দারকাটার ইউনিয়নের খুরুইল্যার কুমে সংযুক্ত করার কারণে অনেক পাহাড় ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী ও পেকুয়ায় সবজি চাষ ও গবাদি পশু পালন কমে গেছে।

জলজপ্রাণি ও মিঠাপানির সংকটে জীব বৈচিত্র্যেও অস্থিত্বের সংকটে পড়েছে মাতামুহুরী। ইতোমধ্যে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার একর ফসলি জমির উৎপাদিত ফসল বহন ও বিপণনে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বর্ষাকালে বন্যার সময় প্রচুর লাকড়ি ভেসে আসতো কিন্তু এখন তাও কমে গেছে। দু’পাড়ের বাসিন্দাদের এসব লাকড়িই জ্বালানি হতো পুরো বছরের ।

অপরদিকে নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় প্রভাবশালী মহল নদী থেকে বালু উত্তোলন করে গতিপথ পরিবর্তনসহ মাতামুহুরীকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

একসময় চকরিয়ার প্রসিদ্ধ ছিলো গাছের ব্যবসা। এই গাছবাণিজ্য ঘিরে মাতামুহুরী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিলো অসংখ্য স’মিল। আলীকদম থেকে বিভিন্ন গাছ লক্ষ্যারচর ও কৈয়ারবিলে বিভিন্ন স’মিল থেকে সাইজ করে কুতুবদিয়া চ্যানেল দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতো ব্যবসায়ীরা। এভাবে গত এক যুগ ধরে চকরিয়ায় গাছ, বাঁশ ও পাহাড়ি জুম ব্যবসায় ছিল জমজমাট। কিন্তু এখন আর সেই গাছ ব্যবসার জৌলুস নেই।

১৮৭৮ সালের ভারতীয় বন আইনে তৎকালীন দ্যা গভর্মেন্ট অব বেঙ্গল ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর মাতামুহুরী নদীর অববাহিকায় প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিকে মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করে। যাতে এ নদীর নাব্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অটুট থাকে। কিন্তু এ রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে গত দেড় দশক ধরে অবাধে বৃক্ষ নিধন, বাঁশ কর্তনে পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে পড়ছে নদীতে। ফলে নদীর তলদেশ ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও পাহাড় ও ঝিরি খুঁড়ে অবাধে পাথর উত্তোলনের কারণে পানির প্রবাহ কমে গেছে। নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। আবার বৃষ্টিপাত থেমে গেলে নদী হয়ে পড়ছে শীর্ণকায়।

এদিকে মাতামুহুরী নদীর নাব্য সংকটে প্রতি বছর গড়ে ৪ থেকে ৫ বার ভয়াবহ বন্যায় লামা, আলীকদম ও চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও জনবসতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্ষা শেষ হতে না হতেই নদীর বুকে জেগে উঠে অসংখ্য চর। নদীর নাব্য হ্রাসের ফলে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা জনবসতির চরম কষ্ট দেখা দেয়।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ শামসুল তাবরীজ সিটিজি নিউজকে বলেন, অবৈধভাবে পাহাড় খনন করে পাথর আহরণ, নির্বিচারে বনজ সম্পদ উজাড় ও পাহাড়ে আগুন দিয়ে জুম চাষের কারণে প্রতি বছর বর্ষায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটি ও বালি এসে মাতামুহুরী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমেও প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীর বুকে জেগে উঠছে চর। ফলে এক সময়ের খরস্রোতা মাতামুহুরী ভরাট হয়ে এখন পানিবিহীন চর।

তিনি আরও বলেন, মাতামুহুরী নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসন থেকে অভিযান চালিয়ে গত ৫ মাসে বালু উত্তোলনের দায়ে প্রায় ৪০০ ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়ারও বন উজাড় ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে গত তিন মাসে ৮টি অভিযান চালিয়েছি।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী সিটিজি নিউজকে বলেন, মাতামুহুরী নদী রক্ষায় চকরিয়া পৌরসভা এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করা হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাইদি বলেন, গেল আশির দশকে মাতামুহুরী নদীর গভীরতা ছিল ৫০ থেকে ৬০ ফুট। প্রস্থ ছিল ৩শ‘ থেকে ৪শ’ ফুট পর্যন্ত। নদীতে ছিল বড় বড় কুম (বিশাল নীল জলরাশি)। বর্তমানে তলা ভরাট হয়ে নদীর গভীরতা আছে ১৫-২০ ফুট পর্যন্ত। গভীরতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে দু’কূল ভেঙ্গে প্রস্থ বেড়ে ১৫’শ থেকে ১৬’শ ফুট পর্যন্ত হয়েছে। অথচ এককালের গভীর জলরাশি সম্পন্ন প্রমত্তা মাতামুহুরী কালের বিবর্তনে এখন শীর্ণকায় নদীতে রূপ নিয়েছে।

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় ১১৮ কিলোমিটার ও ১৮৮০ একর আয়তনের মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের আলীকদম-লামা হয়ে চকরিয়ার বুক চিরে পেকুয়া হয়ে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেলের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে।

এসএম

Advertisement