ঈদ এলেই বাড়ে বেতন-বোনাসের ভোগান্তি!

273
 মোস্তফা কামাল |  শুক্রবার, মে ৭, ২০২১ |  ৩:০৮ অপরাহ্ণ
ছবি: প্রীতম নন্দী

শ্রমিকদের মূল বেতনের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বোনাস দিয়েই দায় সাড়ে চট্টগ্রামের ৮৫ ভাগ গার্মেন্টস। এছাড়া ঈদ এলেই শুরু হয় অনেক গার্মেন্টসের লে আউট ও কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়া। চট্টগ্রামে ২৪৫ গার্মেন্টসের মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ গার্মেন্টসই তাদের শ্রমিকদের সর্বশেষ মূল বেতনের সমান অর্থ বোনাস হিসেবে দিয়ে থাকে।

এদিকে ফ্যাশন ওয়ার্স, ইত্যাদি এপারেলস, কমবাইন্ড এপারেলস, গোল্ডেন সন, এপারেলস প্রমোটারস লিমিটেড, লিগেসি ফ্যাশন লিমিটেড, এশিয়ান গ্রুপ, সাদ মুসা ফেব্রিক্স লিমিটেড, আল আমিন গার্মেন্টস লিমিটেড এবং ফোরএইচ গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপেও শ্রমিক ছাঁটাই ও বোনাস না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

Advertisement

২০ রমজানের মধ্যে তাদের বেতন পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বেতনভাতা পরিশোধ করেনি অনেক প্রতিষ্ঠান। এতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে শিল্প পুলিশ।

গত বছরও ঈদের আগে ফুল বোনাসের দাবিতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার নতুনপাড়া এলাকায় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘষের্র ঘটনায় পুলিশের ১০ সদস্যসহ ২৫ জন আহত হন।

মুনছুরাবাদের ফ্যাশন ওয়ার্স ও পিওম নামে দুইটি কারখানার প্রায় ৬০০ শ্রমিক সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছিলো। রোজা রেখে নিজেদের শ্রমের মজুরি আদায়ে রাস্তাতেই নামতে  হয়েছিলো ফোরএইচ গ্রুপের মালিকানাধীন ফোরএইচ লিঙ্গারি লিমিটেডের শ্রমিকদের।

এছাড়া প্রায় ৫০০ শ্রমিকের দুই মাসের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা পরিশোধ না করে ৪৫ দিনের লে অফ ঘোষণা করেছিলো চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ (সিইপিজেড) এলাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানা পদ্মা ওয়্যারস লিমিটেড। গত ২৯ এপ্রিল এ গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।  একই দিন ‘সি.এম সুপেরিয়রস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও দু মাসের বকেয়া বেতন না দিয়ে উল্টো কর্মী ছাঁটাই করে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন কারখানাটির শ্রমিকরা। সেদিন বিকেলেই এম.এ. এ্যাপারেলস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক শ্রমিক বকেয়া বেতনের দাবিতে বহদ্দারহাট সড়ক অবরোধ করে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন সিটিজি নিউজকে বলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এবছরও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ঈদের ১২ দিন আগে থেকেই সন্দেহজনক গার্মেন্টসগুলোর দিকে শ্রমিক ইউনিয়ন নজর রাখছে। আমরা ২৮ রমজান পর্যন্ত এসব কোম্পানির মতিগতি পর্যালোচনা করে দেখবো। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে হাতে তোলা ঈদ বোনাস দিয়ে থাকেন অধিকাংশ গার্মেন্টস।

বিজিএমইএর দাবি, তাদের সব সদস্য কারখানায় আগের মতো অর্ডার নেই । বায়ারদের নতুন অর্ডার এলে কোম্পানি লাভবান হবে । তখন শ্রমিকদের বোনাস দিতে কাপর্ণ্যবোধ করে না মালিক। এই করোনা কালে নতুন অডার্র না আসায় মালিকেরা শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস দিতেও হিমশিম পড়েছে। অধিকাংশ ফ্যাক্টরি লোকসানে রয়েছে তাই বোনাস দিতে বাড়তি চাপে রয়েছে মালিকেরা।

অথচ বিজিএমইএ সূত্র জানায়, গত ২০২০ সালের এপ্রিলে  বিশ্বব্যাপি রপ্তানি হয়েছিলো ৩৭৪ দশমিক ৬৭ কোটি মার্কিন ডলার। আর ২০২১ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হয়েছে ২৫১৬ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা যা গত বছরের তুলনায় ৫৭১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও শ্রমিকনেতারা জানান, ঈদের আগে যেসব কারখানা বেতনভাতা পরিশোধ করেছে, তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ কারখানা বেতন দিলেও বোনাস দেয়নি। আবার বোনাস দিলেও ওভারটাইম দেয়নি। অন্যদিকে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কারখানা পুরো মাসের বেতন ও মূল বেতনের শতভাগ বোনাস দিয়েছে। তবে মাঝারি ও ছোট কারখানার মালিকেরা যত টাকা বোনাস দিয়ে আপস করাতে পারছেন, তাই দিয়েছেন। এটি আবার মূল বেতনের ২০ থেকে শুরু করে ২৫ শতাংশের বেশি নয়।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরির্দশন অধিদপ্তরের উপ-পরির্দশক আবুল্লাহ আল সাকিব মুবায়রাত সিটিজি নিউজকে বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকল গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান আগামী ৮ তারিখের মধ্যে বোনাস পরিশোধ করবে। এর আগে অনেক প্রতিষ্ঠান বোনাস দিয়ে ফেলেছে। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ১০ থেকে ১২ টি গার্মেন্টসে বকেয়া বেতন নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু আমরা এই সব প্রতিষ্ঠানের মালিক, পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক বসে সমস্যা সমাধান করেছি।

বাংলাদেশ তৈরি পোষাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্টান (বিজিএমইএ)’র সহ সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী সিটিজি নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামে ২৪৫টি কারখানার বেতন-বোনাস বিষয় নিয়ে বিজিএমইএ সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে। এখন পর্যন্ত আমরা ১৪১টি কারখানা পরিদর্শন করেছি যেখানে চ্যালেঞ্জ আছে। শ্রমিকদের সাথে ছলনা কিংবা প্রতারণা করতে পারে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ৭ থেকে ৮টি কারাখানার নাম আমাদের কাছে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিক ছাঁটাই বা বেতন বঞ্চনা’ এ ধরনের বিষয়ে কারখানা মালিকদের দিকেই র্সবদা অভিযোগের আঙুল তোলা হয়। অথচ বায়াররা আমাদেরকে নতুন কোনো অর্ডার দিচ্ছে  না । কী করে ফ্যাক্টরি চালাবো? বায়াররা যদি অর্ডার দিতো, মাল যদি আবার এক্সপোর্ট করতে পারতাম, তাহলে আমরা শ্রমিকদের সন্তুষ্ট করতে পারতাম।

কী পরিমাণ রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, গত বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অনেক অর্ডার বাতিল হয়েছিল। এখন আবার সেগুলো ফিরে এসেছে। এখন অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তারপরও ২০ থেকে ৩০ ভাগ ফ্যাক্টরিতে কোনো অর্ডার নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ডেপুটি পরিচালক ইউসুফ আল মামুন সিটিজি নিউজকে বলেন, গত বছর সরকার বেতন পরিশোধের জন্য গার্মেন্টস খাতে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছিলো। কিন্তু এবছর এখনও পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা ঘোষণা না করলেও মালিকেরা প্রণোদনার জন্য আবেদন করেছেন। শ্রমিকদের বোনাস দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের এই কার্পণ্য মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বোনাস দেওয়ার বিষয়টি প্রজ্ঞাপন আকারে নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। কিন্তু পোশাকশিল্পেও এমন কিছু করা দরকার। তখনই শ্রমিক আন্দোলন থামবে অন্যথায় দিন দিন আরও জটিল হতে থাকবে, বিদেশি বায়ারদের কাছে দেশের সুনাম নষ্ট হবে।

‘লাভ-লোকসানের সাথে উৎসব ভাতার সম্পর্ক নেই, এটি নিয়মিত বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান লাভ লোকসানের দিকে না তাকিয়ে বেতন ও বোনাস দিয়ে থাকেন । অধিকাংশ গার্মেন্টস বকেয়া বেতন ও বোনাস পরিশোধে ঠগবাজি করে থাকে। শিগগিরই বিষয়টির সমাধান না করলে কোরবানির ঈদেও বোনাস নিয়ে জটিলতা দেখা দিবে।

এই বোনাস, বেতন ও নির্যাতন নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সুনাম নষ্ট হওয়ায় ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছে বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কেএন

Advertisement