জলাশয় দখলসহ নানা সীমাবদ্ধতায় কমছে চিংড়ি ঘের!

208
 মোস্তফা কামাল |  বৃহস্পতিবার, মে ১৩, ২০২১ |  ৮:০২ অপরাহ্ণ

কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ হলেই বিভিন্ন ঘেরে হিড়িক পড়তো চিংড়ি চাষে কিন্তু এখন তার ঠিক উল্টো চিত্র।  উপযুক্ত ঘেরের অভাব, পানিতে অতিমাত্রা লবণাক্ততা ও ব্যাকটেরিয়ার প্রাদুর্ভাব, চিংড়ির ফিড ও কেমিক্যালের দামবৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় এ বছর চিংড়ি চাষে অনীহা দেখাচ্ছেন ঘের মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

বিভিন্ন প্রকল্পের নামে জলাশয় দখল হয়ে যাওয়ায় কমছে চিংড়ি চাষ। ফলে কক্সবাজার জেলায় চিংড়ি চাষের প্রায় ৬৫ হাজার একর জলাশয়ের মধ্যে চাষ হচ্ছে মাত্র ৪৫ হাজার একরে । বিনিয়োগের চেয়ে উৎপাদিত পোনার বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় চিংড়ির পরিবর্তে লাভজনক অন্যান্য মাছ চাষে ঝুঁকছেন তারা।

Advertisement

হ্যাচারি সূত্রে জানা যায়,সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ শেষ হওয়ার পর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়ে থাকে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে খামার প্রস্তুত করে চিংড়ি চাষের প্রাথমিক প্রক্রিয়া আরম্ভ করা হয়। এর পর পোনামজুদ, মজুদকৃত পোনা পরিচর্যা, একমাস পর মূল খামারে পোনা অবমুক্ত করণ ও ঘেরে প্রতিপালনসহ বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে বাগদা চিংড়ি বিক্রিযোগ্য। বর্তমানে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে ৩৫টি হ্যাচারি চালু থাকলেও চলতি মৌসুমে উৎপাদনে রয়েছে মাত্র ১৫টি।

সাগরের পানিতে অতিমাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার কারণে চলতি মৌসুমের শুরুতেই বিপাকে পড়েছেন কক্সবাজারের চিংড়ি পোনার হ্যাচারিগুলো। এছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা ফিড, কেমিক্যালের ওপর ২০ শতাংশ কর আরোপের কারণে কক্সবাজারে চিংড়ি চাষ হ্রাস পাচ্ছে এমন মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

চিংড়ি চাষীদের অভিযোগ, এলাকার প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা একত্র হয়ে পানি চলমান খাল বা শাখা নদী দখল করে অন্য মাছ চাষ করায় তাদের চিংড়ি ঘেরে পানি প্রবেশ করাতে পারছেন না। ফলে হাজার হাজার চিংড়ি চাষীদেরকে চরম ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। চিংড়ি ঘেরে জোয়ার—ভাটার সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি প্রবেশ করাতে না পারায় অক্সিজেনসহ মাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য স্বল্পতার কারণে মাছে মড়কসহ বিভিন্ন প্রকারের পানিবাহিত রোগ সৃষ্টি হয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ মারা যায়।

চাষীরা আরও বলেন, চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা ও বদরখালী ইউনিয়নের চরনদ্বীপ, রামপুর ও বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডজন খানেক প্রবাহমান শাখা নদী রয়েছে। দখলবাজরা সিন্ডিকেট করে খালের উভয় পাশে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে চিংড়ি চাষের পরিবর্তে অন্য মাছ চাষ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মহেশখালী মাতারবাড়ি মৌজার আওতায় ১১৯৭.৮৮ একর জমি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে ৭০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পেকুয়া উপজেলার মগনামা মৌজায় ৩৩৩.৭৩ একর জমি নিয়ে হচ্ছে নৌবাহিনীর সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ প্রকল্প। একই উপজেলায় করিয়ারদিয়া মৌজার ১৩৬৮.৮২ একর জমিতে হচ্ছে ইজিসিবির ১২০০ মেগাওয়াটের আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। এস আলম গ্রুপের অধিগ্রহণের নামে হাজার হাজার একর জমি দখল করে চিংড়ি চাষযোগ্য জমি নষ্ট হয়েছে।

বৃহত্তর ঈদগাঁও উপকূলীয় ইউনিয়ন ইসলামপুর, পোকখালী, চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালীতে শতাধিক চিংড়ি খামারে অতিমাত্রায় লবণাক্ত পানি নির্গমন ও নিষ্কাশন গেট বিকল থাকায় চিংড়ি আহরণ ব্যাঘাত হচ্ছে। পোনা উৎপাদনের জন্য কক্সবাজার উপকূলের কলাতলী, ইনানী ও টেকনাফ সৈকতে স্থাপিত ৫৭টি প্রজনন হ্যাচারিও ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার নিরিবিলি ফিশারিস লিমিটেড’র মহা-ব্যবস্থাপক সুজন বড়ুয়া সিটিজিনিউজকে বলেন, কক্সবাজারে পানিতে অতিমাত্রার ব্যাকটেরিয়ার কারণে প্রতিবছরই চিংড়ি মাছ মারা যাচ্ছে। উৎপাদনে থাকা হ্যাচারি ফিড ও কেমিক্যালের ওপর ২০ শতাংশ করারোপ এবং চোরাইপথে পোনা আসায় বিপাকে পড়েছি আমরা। পাচ্ছি না চিংড়ি পোনার ন্যায্যমূল্য। এছাড়া মৎস্যও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং কাস্টমস ও ভ্যাটের বিভিন্ন নীতিমালা জটিলতার কারণে ফিড, মেডিসিন ও কেমিক্যালগুলো জাপান, আমেরিকা, চীন, ভিয়েতনাম থেকে যথাসময়ে আমদানি করতে না পারায় চিংড়ি চাষে প্রভাব পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ পদ্ধতিতে হাজার হাজার একর জমিতে চিংড়ি চাষ হওয়ায় পর্যাপ্ত চিংড়ি চাষের জন্য গত ২০১৮ সালের দিকে বায়ু সিকিউরিটি পদ্ধতিতে ৪টি ঘের চালু হলেও নানা প্রতিকূলতায় টিকে আছে মাত্র ২টি। বর্ষাকাল বাগদা চিংড়ি চাষের উপযুক্ত সময় কারণ এসময় সাগরে লবণাক্তা ১১ থেকে ১৮ পিপিটি থাকে, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা থাকে ৩২ পিপিটি। তাই বর্ষাকালেই চিংড়ি উৎপাদন বাড়ে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিস ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক নুরুল আবছার সিটিজি নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ গলদা চিংড়ির হ্যাচারি গুণগতমান সম্পন্ন পোনা উৎপাদনের উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক উৎস থেকে ডিমওয়ালা গলদা চিংড়ি সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু অতি আহরণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট, দূষণ ইত্যাদি কারণে ডিমওয়ালা গলদা চিংড়ি অনেকটা দুষ্পাপ্য হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মা মাছের ডিম প্রজনন রক্ষায় সমুদ্রে প্রতিবছর সরকার ঘোষিত ৬৫ দিনে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে অথচ ভারতে সেই সময়ে সমুদ্র থেকে প্রচুর মাছ শিকার করে জেলেরা। একইসাথে ভারতে উপকূলীয় অঞ্চলে পযার্প্ত পরিমাণ চিংড়ি পোনা আহরণ হয়ে থাকে। তাই চোরাই পথে সাতক্ষীরা দিকে পোনা সংগ্রহ করার প্রবনতা বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সমুদ্রে বিষাক্ত জৈব কণা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘেরে চিংড়ি পোনা নষ্ট হচ্ছে এতে চাষীরা ক্ষতি সম্মুখীন হচ্ছে । চিংড়িতে কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া কিংবা রোগ আসলে পুরো ঘেরের চিংড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরকে আধুনিক পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করতে হবে। তবে কোন ধরনের পরিবেশ ক্ষতি হয় এমন কিছু করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন, সরকার দেশে ক্লাস্টার পদ্ধতি চালু করছে। এটা চালু হলে পোনার উৎপাদন বেড়ে যাবে। প্রতি মৌসুমে কক্সবাজারের হ্যাচারিগুলো ১৫০০ কোটির বেশি চিংড়ি পোনা উৎপাদন করে। যা চাষের জন্য সরবরাহ করা হয় সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনাসহ চকরিয়া ও মহেশখালীতে।

এসএম

Advertisement