বাজেট ভাবনায় বিজিএমইএ’র সহ সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী

408
 মোস্তফা কামাল |  শুক্রবার, মে ২৮, ২০২১ |  ৮:৫৭ অপরাহ্ণ

আগামী ৩ জুন, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে ২০২১—২০২২ অর্থবছরের বাজেট। প্রতিবছরই ঘোষিত হয় বাজেট তবে তা নিয়ে থাকে আলোচনা ও সমালোচনা। বাজেট ভাবনা নিয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনদের অভিমত জানতে চেয়েছে সিটিজি নিউজ। বিজিএমইএ’র সহ সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরীর সাথে একান্ত আলোচনায় উঠেছে এসেছে বাজেট নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর।

কেমন বাজেট চান এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজিএমইএ সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘গার্মেন্টস বাঁচলেই, শ্রমিক বাচঁবে” বাঁচবে তার পরিবারও’ এই বিষয়কে সামনে রেখে আসন্ন বাজেটে গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ব্যাংক ঋণে বিধি নিষেধসহ আমদানি রপ্তানিতে ব্যাংকে এলসি খোলার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণে অনেক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে পড়েছে । এছাড়া ভ্যাট সার্টিফিকেশন অর্জন, বন্দর ও কাস্টমসের নানা বিধি নিষেধ ও নীতিমালার কারণে ক্ষুদ্র ও স্বল্প পুঁজির গার্মেন্টসগুলো বর্তমানে রুগ্ন এবং নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

Advertisement

রাকিবুল আলম চৌধুরীর পরামর্শ হলো- দুর্বল এবং স্বল্প পুঁজির গার্মেন্টসগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাংক ঋণে বিধি নিষেধসহ আমদানি রপ্তানি নীতিমালার শিথিল করা দরকার। তাই আসন্ন বাজেটে মালিক শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠনের জন্য বিজিএমইএ এর পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এ ধরনের তহবিল না থাকায় শুধু চট্টগ্রামে ২০১৩ সালের পর থেকে ৬০৭টি গার্মেন্টসের মধ্যে বর্তমানে অস্তিত্ব আছে মাত্র ২৪১টি গার্মেন্টসের। চট্টগ্রামে অনেকগুলো গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে তাই আমাদের স্লোগান গার্মেন্টস বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে।

কোন প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে বাজেটে এর প্রভাব কতটুকু পড়তে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন বিধিমালায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ নবায়ন করার যে সুযোগ দিয়েছে সেটি আগে ছিল না। এই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান অসৎ পন্থা অবলম্বন করে ব্যাংকের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে তখনই ব্যাংক এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতে ঋণ দেয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এছাড়া এসব চলমান ব্যাংক ঋণের সুদ আসলসহ শ্রমিকের বেতন ও গ্যাস বিদ্যুৎ এবং যাবতীয় মেনটেইন্সের খরচ মিটাতে না পেরে এক পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। এ কারণে ব্যাংকের পাওনা টাকা ফেরত না পেলে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দেয় যা আসন্ন বাজেটেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে সরকারি বেসরকারি অবকাঠামোগত উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

বাজেটে ভ্যাট চার্জ বৃদ্ধি করা হলে এতে পোশকশিল্পে কেমন প্রভাব পড়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানির ভ্যাট সার্টিফিকেশন জন্য জটিলতা তৈরি করছে কাস্টমস,এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। বিগত ৫ থেকে ১০ বছরের হিসাব নিকাশ, চালান ও ব্যাংক ডকুমেন্টস নিয়ে যেকোনো গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা ভ্যাট চার্জ ধার্য করে দেয়, এতে রুগ্ন ও ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠে। এ কারণেও অনেক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে যায়।

এসব গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংক থেকে এই ঋণ সুবিধা না পেয়ে থাকে তখন তারা নতুন মেশিন আমদানিও করতে পারে না তাই তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের ঘাটতি থাকে। ফলে ভারত,ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া চায়নার মতো আপডেট গার্মেন্টস ও কোয়ালিটি সম্পন্ন প্রোডাক্ট তৈরি করতে না পারায় বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) নতুন অডার্র দিতে অনিহা প্রকাশ করেন।

বাজেটে শ্রমিকদের জন্য কেমন সুযোগ সুবিধা রাখা উচিৎ এমন প্রশ্নে রাকিবুল আলম বলেন, যেকোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে আসন্ন বাজেটে শ্রমিকের জন্য চিকিৎসা, রেশনিং ও বাসস্থানের জন্য একটি বিশেষ প্যাকেজ চালু রাখতে হবে।

গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা কালো টাকা সাদা করে কি না এমন প্রশ্ন উত্তরে তিনি জানান, গার্মেন্টস শিল্পে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নেই । বিদেশ থেকে কোন মেশিন কিংবা যন্ত্রপাতি আনার সময় বন্দর ও কাস্টমসকে আমরা সোর্স টেক্স দিয়ে থাকি।

মানি লন্ডারিংয়ের কারণে বাজেটের উপর প্রভাব পড়ে কি না এ বিষয়ে সহ সভাপতি রাকিবুল আলম বলেন, পোশাক খাতের কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ভুয়া বা জাল এফওসি দেখিয়ে প্রাপ্যতার চেয়ে অতিরিক্ত কাচাঁমাল আমদানি করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এফওসি’র অপব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। এভাবে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে তারল্যের সংকট দেখা দেবে। অথচ ২০২০ সাল থেকে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আগের বছরে রফতানির এক তৃতীয়াংশ কাপড় এফওসি’র ( ফ্রি অব কস্ট) ভিত্তিতে আমদানি করে আসছেন, যার মূল্য পরিশোধ করেন বিদেশি ক্রেতা।

দেশিয় টেক্সটাইল কারখানাগুলোকে ব্যাংক ঋণ, ভর্তুকি, টেকনিক্যাল সার্পোট দিলে শিল্প প্রতিষ্ঠান ঠিকে থাকবে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাণ গ্যাস অত্যাবশ্যক হলেও তা সরবরাহে সরকারের সদিচ্ছা নেই বলেও জানান তিনি।

গার্মেন্টস খাতকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বাজেট ঘোষণা করলে শতভাগ রপ্তানিমুখি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পখাত কাঙ্খিত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে। উৎপাদিত পণ্যের শতভাগই ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে দেশিয় অন্যান্য রপ্তানিকারী খাতের অনুকূলে সরবরাহ হয়ে থাকে। জাতীয় রপ্তানি নীতি, বস্ত্র নীতি ও শিল্প নীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রপ্তানিকারকদের জন্য সমসুযোগের বিধান নির্ধারিত হলেও এ সেক্টরটি কোন সময়ই সমসুবিধা প্রাপ্ত হয় না বলে জানান বিজিএসইএ’র এই নেতা।

তিনি আরও বলেন: গার্মেন্টসের এক্সেসরিজ ও কাঁচামালের জন্য আমাদের আমদানি নির্ভরতা ৯০ শতাংশ। তাই আমদানি ব্যয় বাড়ার চেয়ে আমরা যে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছি তার তুলনা করলে মোটের উপর ডলারের একচেঞ্জ রেটটা পরিবর্তন করা দরকার।

এসএম

Advertisement