খেয়ালখুশির বিলে দিশেহারা গ্রাহক!

874
 নেজাম উদ্দিন সোহান |  বুধবার, জুন ২, ২০২১ |  ৭:০৯ অপরাহ্ণ

খেয়ালখুশির বিলে দিশেহারা গ্রাহক!বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বহীনতা ও দুনীর্তির কারণে খেয়ালখুশির বিলের বোঝায় সীমাহীন ভোগান্তিতে নগরীর পতেঙ্গার ৫০ হাজার গ্রাহক। ব্যবহৃত ইউনিট লিপিবদ্ধ করার জন্য ২৭ জন রিডার থাকলেও মিটারস্থলে না গিয়ে প্রকৃত রিডিংয়ের চার গুণের চেয়েও বেশি মনগড়া বিল তৈরি করে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করছে হাজার হাজার টাকা। অভিযোগ করার পরও সমাধান তো দূরের কথা গ্রাহকদের গুণতে হয় বাড়তি জরিমানা। এভাবে এপ্রিল মাসেই গ্রাহকদের থেকে অগ্রিম সাড়ে ১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘হালিশহর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ অফিসের বিরুদ্ধে। তবে দায় স্বীকার করে বিদ্যুৎ বিভাগ সমধানের পথ প্রি-পেইড মিটার বললেও বাস্তবে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বর্তমানে মিটার প্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই গ্রাহকের।

এদিকে করোনার দুযোর্গের কারণে কর্মহীন ঘরবন্দি প্রায় লোকজনের আয় নেই। সেখানে মনগড়া বিলের খপ্পরে পড়ে গুণতে হচ্ছে প্রকৃত বিলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা। এ নিয়ে ওই এলাকায় গ্রাহকদের মঝে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ ।

Advertisement

অভিযোগ রয়েছে, হালিশহর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ অফিসে ২৭ জন মিটার রিডার থাকলেও মিটার রিডিং দেখতে তারা মিটারস্থলে যান না। মাস শেষে গ্রাহককে ধরিয়ে দেয়া হয় অনুমান নির্ভর বাড়তি বিল। বছরজুড়ে এমন অবাস্তব ও খেয়ালখুশি বিল দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি করছে হালিশহর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ অফিস। মিটার রিডারদের বছরে দুয়েকবার দেখা গেলেও লকডাউনে তারা যেন অমাবস্যার চাঁদ। তাছাড়া অদক্ষ জনবল দিয়ে বিলের কপি বিতরণ ও মিটার রিডারের কাজ করছে বিদ্যুৎ অফিস। তাই বছরের পর বছর ভোগান্তির শেষ হচ্ছেনা ওই এলাকার ৫০ হাজার গ্রাহকের।

সরেজমিনে ২ জুন, বুধবার ১০টি মিটার ও এপ্রিল মাসের বিলের কপি যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিটি বিলের কপিতে উল্লিখিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ইউনিটের চেয়ে মিটারে রিডিং অনেক কম। বিলে ১৫০ থেকে ১৫৯০ ইউনিট পর্যন্ত বাড়তি ইউনিট দেখিয়ে নেয়া হয়েছে অগ্রিম টাকা। ১০টি বিলে মিটারের চেয়ে রিডিং বেশি দেখানো হয়েছে মোট ৬ হাজার ২ শ ইউনিট। ওই ১০জন গ্রাহক থেকে বিদ্যুৎ অফিস (৩০১—৪০০ হিসেবে) অগ্রিম আদায় করেছে ৩৭ হাজার ২শ টাকা। গড়ে ওই ১০ জনের প্রতিজন থেকে অফিস অগ্রিম নিয়েছে ৩ হাজার ৭ শ ২০ টাকা। এই পরিসংখ্যানে হালিশহর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ পতেঙ্গার ৫০ হাজার গ্রাহক থেকে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চেয়ে অতিরিক্ত আদায় করেছে ১৮ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা।

পূর্ব কাটগড় খালকুইল্যা মুন্সির বাড়ির গৃহিণী সুমি আক্তার জানান, কখনো দেখলাম না রিডিং নিতে মিটার রিডার বাসায় আসতে। অথচ প্রায় বছর যাবৎ অনুমান নির্ভর বিল দিয়ে যাচ্ছে। মিটার রিডার ডালিমকে ফোন করে বিষয়টি জানালে বলেন, আগামী মাসে কমিয়ে বিল এডজাস্ট করে দেয়া হবে। কথা ও কাজের মিল ওই মাসে দেখা গেলেও পরের মাসে আবার দ্বিগুণ বাড়িয়ে বিল ধরিয়ে দেয়া হয়। উল্লিখিত মিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আজ বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত আমি ব্যবহার করেছি ৬৫৪২ ইউনিট। অথচ বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের এপ্রিল মাসের বিলে আমাকে দিয়েছে ৬৬৯০ ইউনিট। এক মাস আগেই বিদ্যুৎ অফিস আমার কাছ থেকে ১৪৮ ইউনিটের টাকা অগ্রিম নিয়ে নিয়েছে।

নারিকেলতলার মো. রোসাঙ্গীর সিটিজি নিউজকে বলেন, আমার তিনটি মিটার। দুটি ভাড়া ঘরে, একটি আমার নিজের ঘরে। ভাড়া ঘরের মিটার দুটি বিলের চেয়ে ১৫০/২০০ ইউনিট বেশি থাকলেও, নিজের মিটারে (মিটার নং—১০৩৯১৮২২) ১৫৯০ ইউনিটের বিল করে ৯৫৪০ টাকা অগ্রিম আদায় করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। দুই মাস আগেই আমি ৩০হাজার টাকা এক সাথে বিল পরিশোধ করেছি। অতিরিক্ত ইউনিট নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে অনেকের সাথে কথা বললেও কোন সমধান পায়নি। একই অভিযোগ জানালেন ওই এলাকার সাদেক, হাসান, হাসি মিয়া, লিটনসহ ৮ জন গ্রাহক।

সরেজমিনে কয়েকদিন নগরীর ইপিজেড নিউমুরিং হালিশহর বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভূতুড়ে বিলের জ্বালায় অতীষ্ঠ গ্রাহকের ভিড়। কেউ এসেছেন প্রি—পেইড মিটার ব্যবহার করার পরও বিদ্যুৎ বিল এসেছে— এ অভিযোগ নিয়ে। আবার কেউ এসেছেন রিডিংয়ের অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে এ অভিযোগ নিয়ে।

রিডারদের মিটার না দেখা ও ভূতুড়ে বিলের কথাটি অকপটে স্বীকারও করেছেন হালিশহর বিক্রয়—বিতরণ বিভাগের নিবার্হী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন।

দায় স্বীকার করে তিনি সিটিজি নিউজকে বলেন, কেউ এ সমস্যা নিয়ে আসলে বিলে সংশোধন করে দেয়া হয়। তার মতে, এর সমধান একটাই, প্রি—পেইড মিটার লাগানো। ৫০ হাজার গ্রাহকের মাত্র ৪শ জন প্রি—পেইড মিটার ব্যবহার করছেন, বাকী ৪৯ হাজার ৬শ জনের বাসায় ও দোকানে এখনো পোস্ট-পেইড মিটার । যতদ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের প্রি-পেইড মিটার লাগানোর পরামর্শও দেন তিনি|

প্রি-পেইড মিটার লাগানো হলে গ্রাহকদের ভোগান্তি থাকবেনা বলে জানালেও বাজারে প্রি-পেইড মিটার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন নিবার্হী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন।

জেইউএস/ এসএম

Advertisement