ওয়ানস্টপ সার্ভিসের আওতায় আসছে চমেক হাসপাতাল, বাড়ছে সেবার পরিধিও

246
 কেএন সানজিদা |  শুক্রবার, জুন ৪, ২০২১ |  ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

যন্ত্রপাতি ও শয্যা সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে চরম ভোগান্তিস্থল হিসেবে দুনার্ম থাকলেও বর্তমানে তা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি ও ইউনিট সংযোজনের মাধ্যমে বেড়েছে সেবার পরিধিও। ইতোমধ্যে ২০টি আইসিইউ শয্যা, ১০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার, গাইনি বিভাগে নতুন সংযোজিত ইনফার্টেলিটি সেন্টার ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, হৃদরোগে বিভাগে আইভাস সিস্টেম, ক্যান্সার ওয়ার্ড ও বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট আধুনিকায়নে চিকিৎসা সেবায় এক অভূতপূর্ব সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে চমেক হাসপাতাল। এছাড়াও পরিকল্পনা রয়েছে ২ মাসের মধ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু এবং আলাদাভাবে চমেক-২ ইউনিট স্থাপন ছাড়াও ক্যানসার ইউনিট করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে এই হাসপাতালটি। বর্তমানে হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে সিটিজি নিউজের সাথে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবির।

যে হাসপাতালে একসময় বেডের সংকট, সার্জারি, ডায়ালাইসিস, আলট্রাসনোগ্রাফির মত যন্ত্রপাতির অভাব নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার ছিলো, সেই হাসপাতালই এখন সাজছে নতুন সব সংযোজনে। আর এসব সংযোজনকে সম্ভব করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবির।

Advertisement

করোনাকালের শুরুতে চমেক হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই সেনা কর্মকর্তা। ২০২০ সালের মার্চে প্রথম যখন দেশে করোনা শনাক্ত হয়, হাসপাতালে তখন সেই রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হবে কি না, দিলেও সাধারণ এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) বেডের অপ্রতুলতা ভাবিয়ে তোলে চিকিৎসকদের। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে সেই সমস্যা কাটিয়ে এখন অন্যান্য রোগীদের পাশাপাশি দিব্যি করোনা রোগীদের চিকিৎসা চালানোর কাজ সহজ করে দেন তিনি।

সিটিজিনিউজের সাথে বিশেষ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কাজে যোগদানের পরপরই ঠিক করে নিই হাসপাতালের কোন কোন সেক্টরে হাত দিতে হবে। আমি যখন এই হাসপাতালে আসি, তখন আইসিইউ এর বেড ছিলো মাত্র ১২টি। আর সাধারণ বেড ছিলো ১ হাজার ৩১৩টি। অথচ রোগী ছিলো ৩ হাজার। এত রোগীর চিকিৎসা চললেও হাসপাতালের লোকবল ছিলো শুরুর দিকের সেই ৫০০ শয্যার জন্য।

হাসপাতালের বেড বাড়ানোকেই প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু করেন এই পরিচালক। তার সেই প্রচেষ্টায় চমেক হাসপাতালে আজ ২০টি আইসিইউ শয্যায় সমৃদ্ধ। পাশাপাশি করোনা রোগীদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন ১০০ শয্যার আইসোলেশনের।

২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের চলতি মাস পর্যন্ত গাইনী, হার্ট, সার্জারিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়েছেন চিকিৎসা সুবিধার জন্য। গাইনি বিভাগে যুক্ত করেছেন ইনফার্টেলিটি সেন্টার ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন।

এর মধ্যে হাসপাতালে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ক্যান্সার ওয়ার্ড ও বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। হাসপাতাল পরিচালক জানান, ২০১৪ সালেই চমেকে বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট হওয়ার কথা ছিলো। তখন চীনা প্রকৌশলীরা এসে জায়গা দেখে গেলেও এতদিন এর কাজ বিলম্ব হয়েছে। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই চালু হতে পারে এই ইউনিট স্থাপনের কাজ। পাশাপাশি ক্যান্সার ইউনিটের কাজ চলছে। অচিরেই ক্যান্সারের রোগীরা পৃথক এই ইউনিটে আরও পরিপূর্ণ সুযোগ সুবিধার সাথে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

চমেকে রোগীদের আরও দ্রুত চিকিৎসা সেবা দিতে ২ মাসের মধ্যে শুরু হবে ওয়ান স্টপ সার্ভিস, জানান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, এখন একটা রোগীর জন্য বেড আটকে থাকে। তার জন্য অন্য একজন জরুরি রোগীর চিকিৎসা পেতে দেরি হয়। রোগীরা যেখানে আসবেন, সেখানেই তাদের সব চিকিৎসা দেয়া হবে। এতে করে ইনডোরে রোগীদের চাপ কমবে। প্রাথমিকভাবে বর্তমান জনবল দিয়েই ৮০টি বেডে শুরু হবে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের চিকিৎসা সেবা।

এ সবই সম্ভব হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য’ বলেন পরিচালক। তিনি বলেন, আমাদের ডাক্তাররা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সুবিধার রিকোয়ারমেন্ট দিয়েছেন বলেই আমরা এত সব সংযোজন করতে পেরেছি। চমেকে অনেক অভিজ্ঞ ডাক্তার রয়েছেন। দেশ-বিদেশের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তারা পরিচিত। তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছার বলেই হাসপাতাল এখন আরও সমৃদ্ধ হতে যাচ্ছে।

তবে এই এক বছরে হাসপাতালের দায়িত্ব পালন করার পথটি যে একেবারেই মসৃণ ছিলো না, তার অভিজ্ঞতা জানালেন তিনি। বলেন, প্রথম যখন করোনা মহামারি শুরু হয়, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এরপরও চমেক হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা কেন হবে?— এ নিয়ে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং চিকিৎসকরাই। কিন্তু আমি তাদের সাথে কথা বলেছি। আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধানও হয়েছে। যার প্রমাণ, চমেকে ১০০ শয্যার করোনা আইসোলেশন।

হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের দুর্নীতির তদন্তও করেছেন হাসপাতাল প্রধান। গাইনি বিভাগে সার্জারি উপকরণ, দালালচক্র, পার্কিং ও এ্যাম্বুলেন্স নৈরাজ্যসহ বেশকিছু দুর্নীতি খতিয়ে দেখেছেন তিনি। রোগীরা কোনোরকম হয়রানির শিকার হলে অনুরোধ করেন, সরাসরি তার কার্যালয়ে দেখা করে অভিযোগ জানাতে।

হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, সবারই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। সেই সীমাবদ্ধতা নিয়েই কাজ করতে হয়। তবুও বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যখাতে বেশ প্রাধান্য দিচ্ছেন বলে চমেক এখন আরও নতুন নতুন চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে। তারপরও কোনো হয়রানির শিকার বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে যেকোনো রোগী এসে আমার সাথে কথা বলতে পারবেন। যোগ করেন চমেক হাপসপাতালের পরিচালক।
কেএন/ জেইউএস/ এসএম

Advertisement