মনগড়া মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের কোটি টাকা আত্মসাত পদ্মা অয়েলের !

1130
 নেজাম উদ্দিন সোহান |  রবিবার, জুন ৬, ২০২১ |  ৬:৩৯ অপরাহ্ণ

পদ্মা ওয়েলপদ্মা ওয়েল বাংলাদেশ পেট্রেলিয়াম করপোরেশনের অধীনে দৈনিক ভিত্তিক (অস্থায়ী) শ্রমিকদেরকে সরকার নির্দেশিত প্রাপ্য পারিশ্রমিক না দিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো মজুরি প্রদান করছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মজুরি নিধার্রণ করে দিলেও তা না মেনে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে। তবে কতৃর্পক্ষ বলছে, পদ্মা অয়েল বাংলাদেশ পেট্রেলিয়াম করপোরেশনের অধীনে হলেও সম্পূর্ণ সরকারি নয়, তাই এ নিয়ম মানতে বাধ্য নয় তারা। শ্রমিকদের অভিযোগ- সরকার নিধার্রিত মজুরি থেকে শ্রমিক প্রতি দৈনিক ৬৫ থেকে ১১৫ টাকা কেটে রেখে বছরে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাত করছে পদ্মা অয়েলের কতার্ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, গত বছরের অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ভিত্তিক কাজ করা শ্রমিকদের দুটি কাঠামোতে মজুরি হার পুনঃনিধার্রণ করা হয়। নিয়মিত (অস্থায়ী) দক্ষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০টাকা, অনিয়মিত (অস্থায়ী) অদক্ষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৪৭৫ টাকা থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৫৭৫ টাকা করা হয়। অথচ সরকার ঘোষিত মজুরি কাঠামোর তোয়াক্কা না করে শ্রমিকদের নামে মাত্র মজুরি প্রদান করে বাকী টাকা আত্মসাত করছে কোম্পানিটির কর্মকতার্রা।

Advertisement

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি মজুরি কাঠামো না মেনে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে নিজেদের মনগড়া দক্ষ, কিছুটা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে তিনটি কাঠামোতে মজুরি প্রদান করে। এ ধারাবাহিকতায় কোম্পানিটি শ্রমিকদের মজুরি দেয় ৫৩৫, ৪৯৪ ও ৪৬০ টাকা। ট্যাক্স, ভ্যাট ও ঠিকাদারের কমিশন বাদ দিয়ে শ্রমিক প্রতি মজুরি দাঁড়ায় ৪০০, ৩৭০ ও ৩৪৫ টাকা। ফলে শ্রেণিভেদে প্রতিজন শ্রমিক কম পাচ্ছেন ৬৫, ৮১ ও ১১৫ টাকা। এ হিসেবে মোট প্রতি তিনজন শ্রমিককে কম দেয়া হয় ২৬১টাকা।

এদিকে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড দক্ষ ও অদক্ষ মিলে বর্তমানে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কাজ করে প্রায় ৩১৫ জন শ্রমিক। এ হিসেবে প্রতিদিন পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড তাদের অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের সরকার নিধার্রিত দৈনিক মজুরি না দিয়ে আত্মসাৎ করছে ২৭ হাজার ৪০৫ টাকা। যা মাস শেষে দাঁড়ায় ৮ লাখ ২২হাজার ১৫০টাকা। এ হিসেবে বছরে কোম্পানি কতৃর্পক্ষ শ্রমিকদের মজুরির ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০০ টাকা আত্মসাত করছে। এছাড়াও দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে (অস্থায়ী) আরও শ্রমিক রয়েছে। যাদের অবস্থাও একই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে কর্মরত এক শ্রমিক সিটিজি নিউজকে জনান, শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সরকার নিধার্রিত মজুরি কাঠামো থাকলেও তা মানছে না কোম্পানিটির কর্মকর্তারা। শ্রমিকদের ঘাম ঝরা অর্জিত মজুরি আত্মসাত করছেন তারা। ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করলেও সবার মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক জানান, ১০ থেকে ১২ বছর আগে শ্রমিকদের একটি সংগঠন থাকলেও বর্তমান কোনো সংগঠন নেই। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কোনো কথা বলার সাহস এখন কারো নেই।

তিনি বলেন, আমাদের অনেক দিন এমনও হয় ১২ ঘণ্টা কাজ করে বেতন পাই ৮ ঘণ্টার। ১৬ ঘণ্টার কাজ করে দেয়া হয় ১২ ঘণ্টার মজুরি। কর্মকতার্দের ভয়ে কেউ কিছু বলে না। এ বিষয়ে কোনো সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছি- জানলে আমার চাকরি থাকবে না’ বলে যোগ করেন ওই শ্রমিক।

জানা গেছে, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড’র স্থায়ী চাকুরিজীবীদের দাবি আদায়ে শ্রমিক সংগঠন থাকলেও অস্থায়ী শ্রমিকদের দাবি আদায়ে নেই কোনো সংগঠন। তাই কেউ ন্যায্য পাওনা নিয়ে ভয়ে কথা বলতে নারাজ।

তবে শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি জসিম উদ্দিন সিটিজি নিউজকে বলেন, আমরা স্থায়ী শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করি। তবে আমি অস্থায়ী শ্রমিকদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক বলেছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। যে হারে তাদের মজুরি দেয়া হচ্ছে, তা বর্তমান বাজার মূল্য হিসেবে কিছুই নয়। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড তাদের উপর অবিচার করছে বলেও জানান তিনি।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এইচআর এন্ড এডমিন) শহিদুল আলম সিটিজি নিউজকে বলেন, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড সম্পূর্ণ সরকারি নয়। তাই সরকারি নির্দেশনা মানতে বাধ্য নয় প্রতিষ্ঠানটি। এটা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তের আলোকে পরিচালিত হয়। তারা যে সিদ্ধান্ত নেন, সে হিসেবে কোম্পানি চলে।

তবে বর্তমান বাজার মূল্যে অস্থায়ী শ্রমিকদের বেতন যথার্থ নয় বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ম্যানেজমেন্ট এর সাথে কথা চলছে এবং ব্যবস্থা নেয়া হবে। আরো বিস্তারিত জানতে হলে তিনি ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন এন্ড প্ল্যানিং) মো. আবু সালেহ ইবকার’র মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান (সচিব) এ বি এম আজাদ এনডিসি সিটিজি নিউজকে বলেন, আমি নতুন এসেছি। এ বিষয়ে তেমন ধারণা নেই আমার। তিনি এই প্রতিবেদককে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বন্টন ও বিপণন বিভাগের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

পরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক মোঃ আবুল কালাম আজাদের (বন্টন ও বিপণন) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড কতৃর্পক্ষের সাথে কথা বলতে বলেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবেন।

জেইউএস/ এসএম/কেএন

Advertisement